বুধবার, ১৭ জুন, ২০০৯

ভারসাম্যহীন চাওয়া-পাওয়ার কিছু গল্প...

ঘটনা ১

সুন্দর,হ্যান্ডসাম,শিক্ষিত ছেলের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে।কিন্তু কিছুতেই ছেলের উপযোগী মেয়ে পাওয়া যাচ্ছেনা।কারন ঐশ্বরিয়ার মত সুন্দরী মেয়ে কোথাও মিলতেছেনা।ছেলের মায়ের খুব ইচ্ছা তার বৌমা হবে বিশ্বের সেরা সুন্দরিদের একজন।কিন্তু ব্যাটে বলে মিলতেছেনা।খুব সুন্দরী মেয়ে হলে সে হয় খাট।আবার খুব লম্বা হলে হয় শ্যামলা।এই জাতীয় সমস্যায় যখন সবার ঘুম হারাম তখন হঠাত মিলে গেল কাংখিত ঐশ্বরিয়ার সন্ধান।মেয়ে যেমন লম্বা তেমন সুন্দরী।বাবা মার একমাত্র মেয়ে।মেয়েকে দেখে ছেলের মায়ের খুশি আর ধরেনা।মেয়ের মা বললেন ‘আমার মেয়ে গ্লাসে পানি ঢেলেও খেতে পারেনা,খুব শৌখিন।বিয়ে ,সংসারের ঝামেলা কি সামলাতে পারবে?’ছেলের মায়ের সাথে সাথে জবাব...আমি আমার বৌমাকে ঘরে সাজায় রাখব।তাকে দিয়ে কখনো কাজ করাব নাকি?আমার নিজের মেয়ের মত করে রাখব...এত সুন্দর জবাবে মেয়ের মায়ের আর কোন কথা থাকেনা।খুব দ্রুত বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যায়।

যথাসময়ে বিয়ের কিছুদিন পর ঐশ্বরিয়ার মত সুন্দরী বৌ এর সৌন্দর্য আর ভাল লাগেনা।শ্বাশুড়ী বৌ এর প্রতিটা পদক্ষেপে ভুল ধরে।খুব তিক্ত সম্পর্কের শুরু হয়।ওদিকে স্বামীর সাথেও বৌ এর আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভাল হয় না।কে কখন ফোন করে,কি মেসেজ দেয় এই নিয়ে শুরু হয় মান-অভিমান।একসময় বিশ্বাস-অবিশ্বাস এর এক কঠিন স্থানে দাঁড়িয়ে যায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক।ঐশ্বরিয়ার মত সুন্দরী মেয়ের এভাবে দ্বন্দ্ব-কলহে চলতে থাকে সাংসারিক জীবন...


ঘটনা ২

মেয়ে খুব সুন্দরী,পড়াশুনায় খুব বেশি ভাল না হলেও আনেক স্মার্ট।প্রসেনজিত তার ড্রীমহিরো।প্রসেনজিতের স্বপ্নে বিভোর থাকে সর্বদা সে।মেয়ের বাবা এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব।মেয়ের বিয়ের জন্য তাই যে ছেলে খোজা হচ্ছে তাকে হতে হবে সেইম রাজনৈ্তিক আদর্শের অনুসারী।তো একসময় বাবার ও মেয়ের পছন্দ অনুযায়ী ছেলের সন্ধান পাওয়া যায়।বাবার আদর্শবান ও মেয়ের স্বপ্নের হিরোর সাথে বিয়ের কথা চূড়ান্ত হয়।এবং বিয়েও হয়......


বছরখানেক পর শ্বশুরের সাথে জামাই এর দ্বন্দ্ব শুরু হয় রাজনৈ্তিক ব্যাপার নিয়ে।দ্বন্দ্বটা একসময় খুব চরম আকার ধারন করে এবং পরবর্তিতে বাপের বাড়ির সাথে মেয়ের সমস্ত সম্পর্কের ইতি টানতে হয় চিরতরে...


ঘটনা ৩

মেয়ে শিক্ষিতা,সুন্দরী,মোটামুটি ধার্মিক।মেয়ের বিয়ের বয়স চলে যাচ্ছে চিন্তা করে ছেলে দেখার ধুম পড়ে গেছে।সবাই খুব মহড়া করে ছেলে খুজতেছে।একটা ছেলে পাওয়া গেল।ইঙ্গিনিয়ার,বুয়েট থেকে পাস।সবই ঠিকঠাক কিন্তু সমস্যা হল ছেলের দাড়ি নিয়ে।ছেলে খুবি ধার্মিক।শুধুমাত্র দাড়ির জন্য এত সুন্দর একটা ছেলে কে হাতছাড়া করতে হল।তারপর আবার ছেলে দেখার পর্ব...এবার যে ছেলে পাওয়া গেল সে অসম্ভব হ্যান্ডসাম,শিক্ষিত,রাজউক এ চাকরি করে,অনেক মোটা বেতনের চাকরি।মেয়েরো ছেলেকে পছন্দ।তাই সবকিছু দেখে শুনে বিয়ে দেয়া হল মেয়েকে।
বছর খানিক পর দুর্নীতির অভিযোগে জামাই এর চাকরি চলে গেল।কিন্তু তাতে কি? জামাই তো কোটি টাকার মালিক,তাই মেয়ের সংসারে কোন প্রবলেম হলনা।কিন্তু মেয়ের বাবা-মায়ের চিন্তার কোন শেষ নেই।দুর্নীতিবাজ ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়ে তারা এখন সর্বদা মানষিক কষ্টে সাফার করতেছে...


ঘটনা ৪

এবারের ঘটনা একটু ভিন্ন...মধ্যবিত্ত পরিবারের অত্যন্ত ধার্মিক এবং সুন্দরী মেয়ে।শিক্ষিত এবং ধার্মিক ছেলের জন্য পরিবারের সবাই চিন্তি।ইনফ্যাক্ট শিক্ষিত ছেলে পাওয়া গেলেও ধার্মিক পাওয়া খুব কঠিন।আর ধার্মিক হলে শিক্ষিত হয়না।এই যুগে এই দুই গুনের সংমিশ্রন আসলেই খুব রেয়ার।যাইহোক,মেয়ের চাচার বন্ধুর মাধ্যমে এক উচ্চ শিক্ষিত এবং ধার্মিক ছেলের সন্ধান মিলল,ছেলে অস্ট্রেলিতে পি.এইচ.ডি করছে।উচ্চবিত্ত এবং অত্যন্ত ধার্মিক পরিবারের সন্তান।কিন্তু মেয়ের ফ্যামিলির স্ট্যাটাস এর সাথে ছেলের ফ্যামির স্ট্যাটাস একেবারেই ভিন্ন।দিনক্ষন ঠিক করে একদিন ছেলে পক্ষ মেয়ে দেখতে আসল।্মেয়ে দেখতে এসেই ছেলের + ছেলের ফ্যামিলির সবার পছন্দ হয়ে গেল।স্ট্যাটাস এর ব্যবধান যদিও অনেক বড় কিন্তু যেহেতু মেয়ে ধার্মিক+সুন্দরী তাই ছেলে পক্ষ সবাই রাজি হয়ে গেল।আর মেয়ের ফ্যামিলির তো কোন আপত্তি নেই।তারা যেন পেয়েছে সোনার ছেলে।উচ্চবিত্ত,উচ্চশিক্ষিত,অত্যন্ত ধার্মিক এরকম ছেলে লাখে তো একজন।তারপর বিয়ের সবকিছু চূড়ান্ত হয় এবং যথাসময়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়।

বিয়ের পর...যেহেতু উচ্চবিত্ত পরিবারে মেয়ের বিয়ে হয়েছে তাই সেখানে মেয়ের এডজাস্ট করতে অনেক সময় লাগে।মেয়ের কোন স্বাধীনতা সেখানে নেই।নিজের বাবা-মাকে দেখতে আসার জন্য শ্বাশুড়ির নিকট অনুমতি নিতে হয়।কিন্তু অনুমতি খুব সহজে মিলে না।কঠোর পর্দা রক্ষার জন্য তাই সবকিছুতেই সীমাবদ্ধতা রক্ষা করতে হয়।আর শ্বশুরবাড়ির কেউ মেয়ের বাড়ির সাথে সেরকম সম্পর্ক রাখতে চায়না তাদের স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য।আর জামাই? সে তো মায়ের অনুমতি ছাড়া এক পাও চলেনা।সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে মায়ের কথামত সব কাজ করে।মেয়ের বাবা-মা খুব বেশি খুশি না যতটা তারা বিয়ের আগে ছিল।তারা মেয়ের শ্বশুর বাড়ির সাথে তাল মিলাতে পারেনা।তাদের ৫/৬ টা গাড়ি নেই,বাড়ি নেই।ইচ্ছা করলেই মেয়েকে তারা দেখে আসতে পারেনা।মেয়ে একসময় ছেলের সাথে চলে যায় অস্ট্রেলিয়াতে।বছরে ২ বার দেশে আসে।দেশে আসলেও জামাই এর সাথে মেয়ে তার বাপের বাড়ি আসতে পারেনা।জামাই অনেক রিসার্ভ ।মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় বাবা-মার সাথে।এইতো! মেয়ের বাবা-মার সান্ত্বনা শুধু এইটুকুই যে তারা বলতে পারে তাদের মেয়ে জামাই অস্ট্রেলিয়াতে থাকে,উচ্চশিক্ষিত,ধার্মিক ও ধনি পরিবার।(যদিও ধর্ম টা তারা শুধু নিজেদের মত করে পালন করে।ধার্মিক হওয়া সত্তেও উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত র ব্যাবধান তাদের কাছে কখনো কমে না।)...মেয়ে যেমন সর্বদা বাবা-মা,ভাই-বোন এর চিত্র অনুভব করে তেমনি বাবা-মাও তাদের সেই আদরের মেয়েকে না দেখার বেদনায় তারা দিনযাপন করে।

রবিবার, ৩ মে, ২০০৯

নারী ও ইসলাম


দুদিন পরেই এক্সাম।তাই মাথা গরম।সেলফ স্টাডি তো আছেই সাথে গ্রুপ স্টাডিও চলছে।মেডিকেল লাইফ এ পড়াশুনার বাইরে কোন কিছু চিন্তাই করা যায়না।মহাফাকিবাজ দের জন্য তাই মেডিকেল এ পড়া শাস্তি ছাড়া কিছুইনা।এক্সাম এর আগে আমার শুধুই এই কথাই মনে হচ্ছিল ।কি জানি জীবনে কোন এক পাপের শাস্তি হইত এর মাধ্যমে কাফফারা হয়ে যাচ্ছে।
লাইব্রেরি তে বসে যখন আমরা পাচ ফ্রেন্ড মিলে এইসব আলোচনা করছিলাম তখন আমাদের এক বন্ধু তখন বলতেছে,''তোরা মেয়েরা তোদের তো কোন চিন্তা নাই।বিয়ের আগে বাবার ঘরে আর বিয়ের পরে স্বামীর ঘরে থাকবি।চাকরি বাকরি নিয়ে তোদের কোন চিন্তা নাই।কিন্তু আমাদের অবস্থা দেখ।আমাদের এখন থেকেই চিন্তা করতে হচ্ছে কবে এম.বি.বি.এস পাস করব।কবে টাকা পয়সা ইনকাম করব ফেমিলি র জন্য + নিজের বেপার তো আছেই।'' এই সব বলে যখন সে আফসোস করতেছিল তখন আমার অন্য বান্ধবি রা খুব খেপে গেল।তারা মেয়েদের পক্ষে বলার জন্য আনেক কিছুই বলতেছিল।
আমি ওদের থামিয়ে দিয়ে বললাম '' দোস্ত আমি কিন্তু একজন মেয়ে হিসাবে অনেক হ্যাপি।আল্লাহ আমাকে অনেক ফ্যাছিলিটি দিয়েছে মেয়ে হয়ার জন্য।আমাকে আমার ফামিলির জন্য কোন চিন্তা করতে হয়না।বরং আমাদেরকে সংরক্ষন এর জন্য ছেলেদের অনেক চিন্তা করতে হয়।যা নিয়ে তুই এতক্ষন আফসোস করতেছিলি।বুঝিনা কেন যে মেয়েরা নারী আন্দোলন করে!!(আমার এই বন্ধু টা আবার নারী আন্দোলন এর সক্রিয় কর্মী)।ইসলাম ই যেখানে নারীর পূর্ণ অধিকার দিয়েছে সেখানে নারী আন্দোলন এর মানে আমি বুঝিনা।
এটা বলার পর পরই আমার ওই বন্ধু একটু নড়ে চড়ে বসল।সে এবার নারী আন্দোলনের গুরুত্ব নিয়ে বলতে থাকল।আমি তাকে বললাম যে তুই যতই নারী আন্দোলন করিস কিছুই করতে পারবিনা যতক্ষন পর্যন্ত তুই ইসলাম প্রতিষ্ঠা না করবি।ইসলাম এর কথা আসাতেই সে আমারে বলল আচ্ছা ইসলাম এ হিল্লা বিয়ে নামে যে ব্যবস্থা আছে তাতে কি তোর মনে হয়না যে এর মাধ্যমে নারী কে ছোট করা হয়েছে??এর জবাব তুই কি দিবি??
আমি বললাম হিল্লা বিয়ে নিয়ে ইসলাম এ যে নির্দেশ আছে তা কি তুই পুরাপুরি জানিস?? এর জন্য তুই কি একবার ও কুরআন পড়ে দেখেছিস?আসলে ইসলাম কি বলতেছে হিল্লা বিয়ে নিয়ে...এই কথা গুলা বলাতে আমার ফ্রেন্ড একটু ইতস্তত ফিল করতেছে।বললাম আমি তোকে ছোট করার জন্য এইগুলা বলতেছিনা।তখন সে হিল্লা বিয়ে নিয়ে যা জানে তাই বল্ল।সে যেটা জানে তা হল...''স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলে সেই স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করার জন্য সেই স্ত্রীকে আরেকজন এর সাথে বিয়ে হয়া লাগবে এই শর্তে যে ২য় স্বামী বিয়ের পর তাকে তালাক দিবে।তাহলে ইসলাম এর মতে সেই ২য়বার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে ১ম স্বামী আবার বিয়ে করে ঘরে তুলতে পারবে।''
আমি বললাম তুই জানিস বাট অর্ধেক জানিস।কারন ইসলাম এ কখনও কোন শর্তে এই বিয়ে করা যায়েজ না যে তাকে বিয়ের পরই তালাক দিতে হবে।বাট এটা ঠিক যে স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর মনে করে যে তার ভুল হয়ে গেছে তাই সে তার স্ত্রীকে আবার বিয়ে করতে চায়,তখন সেই স্ত্রীকে অন্য কোথাও বিয়ে করতে হবে,যদি তার ২য় স্বামী তাকে তালাক দেয় তাহলে ১ম স্বামী তাকে আবার বিয়ে করতে পারবে।কিন্তু এখানে ২য়বার বিয়ের সময় তালাক দেয়ার কোন শর্ত দেয়া যাবেনা। আমার এই কথা শুনার পর সে বলল তাহলে সেই স্বামী বেচারার প্রতি অন্যায় হয়ে যাবে।আমি বললাম কেন?? তালাক হচ্ছে আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় হালাল কাজ।তালাক দেয়ার পুর্বে তাই অনেক সতর্কতার কথা ইসলাম এ বলা আছে।ইসলাম কখনো পারমিট করেনা যে স্বামী যখন তখন স্ত্রীকে তালাক দিবে আর মনে হলেই তাকে আবার বিয়ে করবে।নারী কোন অবহেলার বস্তু নয়।তাই স্বামীদের জন্য এই জটিল প্রছেস।তোর কি মনে হয় এতে নারীদের অবহেলা করা হয়েছে?আমার এই কথাগুলা শুনার পর আমার ওই বন্ধু টা বলল ''এখন তো আমার মনে হচ্ছে নারীদের নয় বরং ছেলেদের জন্য অনেক অন্যায় হয়েছে।''
আমি ওর কথা শুনে হাসলাম।সবাই একযোগে হেসে উঠল...।
সবার শেষে আমার ওই বন্ধুটা বলল যে হিযাব এর মাধ্যমে নারী কে অনেক পিছনে রাখা হয়েছে,তাদের কে স্বাধীনভাবে চলতে বাধা দেয়া হয়েছে।তখন আমি শুধু এইটুকুই বললাম ''তোর কি মনে হয় যে আমি হিযাব পরি বলে আমি অনেক পিছিয়ে আছি,স্বাধিনভাবে চলতে পারছিনা??''সে বলল তোর মত তো আর সবাই না।তোকে আর সব মেয়েদের কথাও ভাবতে হবে।আমি বললাম হিজাব যদি আমার ক্ষেত্রে কোন অধিকার নষ্ট না করে তাহলে ওন্য কারো জন্য তা করছেনা।প্রব্লেম টা হল পুরুষরা সমাজে ইসলাম এর ভুল অর্থ করে নারীদের অধিকার নষ্ট করতেছে।নারীদের অধিকার এর জন্য তোরা যদি সত্যি কিছু চিন্তা করিস তাহলে আমার মনে হয় তোদের ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করা উচিত।তাহলেই নারীর অধিকার আদায় হবে।কিন্তু দু:খের বেপার হল তোরাই ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে গাছের আগায় পানি ঢালতেছিস।
শেষে আমার ওই বন্ধু বলল দোস্ত তুই রাজনীতিতে নেমে পড়।আমি বললাম ইসলাম এর কথা মানে যদি তুই রাজনীতি বুঝিস তাহলে আমি তো রাজনীতি করতেছি।!! এই কথা তে সবাই আরেকবার হেসে উঠল।

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০০৯

এক স্বাধীনতার গল্প...৩৮ বছর পর...

"স্বাধীনতা" শব্দটা মনে হলে এক ধরনের অনুভূতি কাজ করে ..একেবারে অন্যরকম । জানিনা কেন ?? এই অনুভূতিটা আরো বেশি গভীর হয় যখন মনে পড়ে ইরাক-কাশ্মীর যুদ্ধের কথা । যখন দেখি গাঁজায় নীরিহ মানুষের বিনা অপরাধে মৃত্যুর অমানবিক চিত্র ।
শুনি, তাদের স্বাধীনতার জন্য আকুল আর্তচিৎকার...তখন নিজেকে খুব বেশি লাকি মনে হয় একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হবার জন্য । প্রতিবার নামাজে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই

১৯৭১... এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা অর্জন করি আমাদের বহু কাঙ্খিত স্বাধীনতা..দোয়া করিসেই সব শহীদদের জন্য যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন আমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেবার জন্য ।

স্কুলে থাকতেএকটা ভাব-সম্প্রসারন পরতাম , "স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন"..তখন এটা ঠিকভাবে বুঝতাম না অথবা সেই ধরনের ম্যাচিউরিটিও সম্ভবত ছিলোনা এটাকে বুঝার মত..আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে স্কুল অধ্যায় পার করে কিছুটা বুঝতে পারছি ..


আমাদের physiology এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ম্যাডাম একদিন বলতেছিলেন, "আমাদের সময় অনেক মালেশিয়ান স্টুডেন্ট বাংলাদেশে মেডিকেল পড়তে আসতো..কিন্তু আজ স্বাধীনতার তিরিশ বছর পর আমাদের দেশ থেকে অনেক স্টুডেন্ট মালেশিয়াতে মেডিকেল পড়তে যায়".. সাথে সাথে মনে পড়ে যায়, হায়দার হোসেনের সেই গানটার কথা , "কী দেখার কথা কী দেখছি, কী শোনার কথা কী শুনছি, কী বলার কথা কী বলছি, কী ভাবার কথা কী ভাবছি..৩০ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি"...খুব হার্ট টাচিং গান !

এখন ২০০৯.... স্বাধীনতার এত বছর পর-ও তাহলে কেন এই গান?? শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান কেমন স্বাধীনতা চেয়েছিলেন যা এখনো আমরা খুঁজতেছি ???

আমি স্বাধীনতা-যুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু টিভিতে দেখেছি শেখ মুজিবের সেই কালজয়ী ভাষণ যা আমাকে ইমোশনাল করে তোলে..কিছুটা বুঝতে পারি স্বাধীনতার জন্য কেন এই গান?? আজ দেশের মানুষ পরাশক্তির হাত থেকে মুক্ত..কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে স্বাধীনতার আড়ালে আমরা আজো পরাধীন.. এই দেশের সরকার পরিবর্তন হয়..পরিবর্তন হয় স্বাধীনতার ছবি..পাঁচ বছর থাকে সরকারী দল ..তারা সবকিছুতে স্বাধীনতা উপভোগ করে..সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজী, হত্যা, চুরি, দুর্নীতি সবকিছু...
তারপর, পরের পাঁচ বছর সরকার পরিবর্তন হয়..পরাধীন হয় আগের পার্টি..পাঁচ বছর পরপর পরিবর্তিত হয় স্বাধীনতার ঘোষকের নাম খুব স্বাধীনভাবে..হায়রে আমার স্বাধীনতা !!!!


বিডিআর মিউটিনি, টক অব দ্যা টাইম.. স্বাধীন দেশের এতবড় সংকটময় মুহূর্তে পার্লামেন্টে দেখি সরকার বিরোধী দলকে দোষারোপ করতেছে...স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা মনে হলে তখন আমার হাসি পায়...দেশের বুদ্ধিজীবিরা বিডিআর-আর্মি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করে..কেউ বলে , "আরর্মি, নোও নীড, দে আর করাপ্টেড"... আমরা জানি পিলখানার এই ঘটনায় নিহত হয় অনেক আর্মি অফিসার যা কোন যুদ্ধেও হয়নি..জাতির এই দুর্যোগের মুহূর্তে কেউ আবার নিজেদেরকে স্বাধীনতার একমাত্র ধারক ও বাহক মনে করে একপেশে পলিটিক্স করে ...আমরা সামগ্রীক জীবনের থেকে ব্যক্তিগত মরনকে প্রাধান্য দেই..১৯৭১ এ দেশের সূর্যসন্তানরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো কি এইজন্য ???

২৬-শে মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস..দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেমিনার, আলোচনা, বিতর্ক, কবিতা-নাচ-গান হয়..২৬ মার্চ কে নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ হয়, কেবল আলোচিত হয়না স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যটা...ব্যক্তিপূঁজা হয়, কিন্তু ব্যক্তি-জীবনি থেকে আমাদের শিক্ষা দেয়া হয়না..আমাদেরকে শেখানো হয়না যে
"স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন"..বুঝানো হয়না, কিভাবে আমরা এই স্বাধীনতা রক্ষা করবো..শুধু হয় দলীয় সঙ্কীর্ণ আলোচনা..স্বাধীনতার সময়ে কার কন্ট্রিবিউশন বেশি ছিলো, মুজিব না জিয়া??? স্বাধীনতা দিবস কি আজ কেবল লৌকিকতায় পরিনত হয়েছে ??


আমি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কোন আলোচনাসভাবর বিরুদ্ধে কথা বলতেছিনা, ..শুধু এটুকুই বলতে চাই যে১৯৭১ এর পর কত আলোচনা হলো , কত কবিতা রচনা হলো এই নিয়ে কিন্তু আমাদের অবস্থার কি কোন পরিবর্তন হয়েছে ? ? ? আমাদের ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ থাকতে পারে স্বাধীনতা বিষয়ে কিন্তু আমি মনে করি চুড়ান্ত লক্ষ্য/গোল/মটো অভিন্ন.. কি সেটা? ..to uphold our liberation... কিন্তু আমরা কিভাবে আমাদের লক্ষ্য অর্জন করবো সেটা আলোচনা করিনা.. আজকের তরুন প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যেমনটা উৎসাহিত, দেশের অনবরত অরাজক অবস্থা তৈরী করা সন্ত্রাসের বিচারের জন্য তারা ততটা উৎসাহ পাচ্ছেনা !
শামসুর রহমানের একটা কবিতা পড়েছিলাম, "স্বাধীনতা তুমি"... স্বাধীনতা বিষয়ে যে উপমাগুলো কবি সেখানে লিখেছেন তা কেবলি মনে হয় কবির কল্পনা ছাড়া আর কিছুনা । আজ "স্বাধীন" শব্দটার-ই অনেক রকম ব্যাখ্যা করে নিজেরাই এটাকে পরাধীন করে তুলতেছি...

আমাদের আসল ভুলটা হয়তো, স্বাধীনতার পরেই আমরা এমন কোন লিডার তৈরী করতে পারিনি যে আমাদের স্বাধীনতা রক্ষা করবে..ফররুখ আহমদ তার "পাঞ্জেরী" কবিতায় মনে হয় এমনি একজন নাবিক কে আশা করেছিলেন ..

আমরা কোন মাহাথীর মুহাম্মাদকে পাইনি ..আমাদের রাজনীতিতে কেউ মুহাম্মাদ সা: এর আদর্শ নিয়ে আসেনি...যিনি ছিলেন সর্বযুগের সেরা পরিপূর্ণ একজন রাজনীতিবিদ... ..খুব খারাপ লাগে, তার উম্মত হয়েও - একটা মুসলিম দেশ হিসেবে আমরা তার আদর্শ এপ্লাই করতে পারিনি.. আজকে দেখি "ধর্মনিরপেক্ষতা" নাম দিয়ে কেউ স্বাধীনতার এক এবসার্ড পিকচার স্ট্যাবলিশ করতে চায়..আমরা কি কেউ ইতিহাস জানিনা ???...মুহাম্মাদ সা: যখন পুরো আরব বিজয় করলেন , তখন একমাত্র জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম কে প্রতিষ্ঠা করে একটা সফল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন...ক্ষমা করে দিলেন সেইসব মানুষদেরকে যারা তার সাথে বিরোধীতা করেছিলো , ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার "অধিকার" প্রতিষ্ঠা করলেন উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন , "তোমাদের প্রতি আজ আর কোন অভিযোগ নেই, তোমরা যেতে পারো, তোমরা আজ মুক্ত ও স্বাধীন...কি অপুর্ব উদাহরন আমাদের সামনে...হায় !! আমরা যদি সেটা বুঝতে পারতাম !!

মুহাম্মাদ সা: এর জীবনি কোন পীর-দরবেশের জীবনি নয়- নয় কোন আরব্য উপন্যাসের এডভেঞ্চারের কাহিনী যে আমরা শুধু রিক্রিয়েশনের জন্য সেটা পড়বো ... আমরা যতদিন পর্যন্ত এই কালজয়ী আদর্শকে বাস্তব জীবনে অনুসরন করতে না পারবো ততদিন পর্যন্ত আমাদের মুক্তি নাই..আমাদের স্বাধীনতা তদিন পর্যন্ত কেবল লৌকিক আচার হিসেবে থেকে যাবে ...স্বাধীনতা কেবল থাকবে কবিতায়, আলোচনায় আর গানে...

স্বাধীনতার গল্পের শেষ এখানেই নয়..কারন এই গল্পের শেষ আমরা যেভাবে চাই তা এখনো হয়নি.. আমরা স্বাধীনতার আড়ালে পরাধীন থাকতে চাইনা...স্বাধীনতার নামে অরাজকতা চাইনা..সত্যিকার স্বাধীনতা চাই... সত্যিকার একজন নেতা চাই যার আদর্শ হবে মুহাম্মাদ সা: .. পূরণ করতে চাই সেই সব শহীদের রক্তের দাবী যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন একফোঁটা স্বাধীনতার জন্য...

আল্লাহ, আমাদেরকে এই স্বাধীনতার গল্প সফলভাবে শেষ করার তাওফিক দান করো । আমাদের মধ্যেই আবির্ভাব হোক একজন মাহাথীর মুহাম্মাদ , একজন ইউসুফ বিন তাশফিন , একজন তারিক বিন জিয়াদ যারা প্রতিষ্ঠা করবে আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা..আমিন..