শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১১

মানসিক দাসত্ব !

একজন নারীর সফল ক্যারিয়ার আসলে কি হওয়া উচিত এটা নিয়ে পুর্বের পোস্টে ব্যাপক আলোচনা হল। শুধু যে আলোচনাই হল তা নয়, আমাকে পারসোনালি অনেকের কাছ থেকে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্নের এন্সার দিতে হল। যেহেতু আমি মেডিকেলে পড়ছি সুতরাং আমি প্রফেশনালি মানবতাকে সার্ভ করব এই প্ল্যান নিয়েই পড়ছি। তাহলে কি আমার পূর্বের পোস্ট অনুযায়ী সফল ক্যারিয়ারিস্টিক নারী হিসেবে আমি নিজেকে দেখতে পাব?

আমি কখনও নারীর উচ্চশিক্ষার বিরুদ্ধে না, নারীর বাইরে জবের বিরুদ্ধে না। কারণ কেবল নারী মুক্তি নয় আমাদের সকল মানসিক দাসত্বের মুক্তির জন্য শিক্ষা প্রয়োজন। কুরআন শুরু হয়েছে "পড়" শব্দ দিয়ে। সেখানে নারী শিক্ষা নিয়ে আমি স্পেসিফিক্যালি কিছু বলতে চাইনা। কথা হচ্ছে নারীর সফল ক্যারিয়ার নিয়ে।

যদি নারীরা মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত না হয় তাহলে অনেক হাই ডিগ্রি, অনেক বড় জব করেও তারা মুক্ত হতে পারবেনা, স্বাধীন হতে পারবেনা। যদি সন্তান পালন, সংসার করাকে নারীত্বের অবমাননা মনে করে নারীরা তাহলে পুরুষের পাশাপাশি বাইরে জবও তাদের ক্যারিয়ারে এক্সট্রা কিছুই যোগ করবেনা। বরং কেবল সুপার উইমেন হবার চেষ্টা তাদের মানসিক ও শারীরিক বার্ডেন বাড়াবে।

একটু চিন্তা করে দেখেন, নারীরা এখন হাইয়ার ডিগ্রি নিচ্ছে, বাইরে জব করছে কিন্তু সন্তান জন্মদান ও লালন পালনের প্রাইমারি কাজ নারীরা কখনও ওভারলুক করতে পারবেনা। কারণ নারীরা যদি হাজার আন্দোলনও করে তাহলে পুরুষরা তাদের এই প্রাইমারি কাজ শেয়ার করতে পারবেনা।

বেগম রোকেয়া নারীদের মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে বহু আগেই লিখে গিয়েছেন ঠিক এভাবে,

"এই অলংকারের জন্য ললনাকূলের কত আগ্রহ! যেন জীবনের সুখ সমৃদ্ধি উহারই উপর নির্ভর করে! তাই দরিদ্রা! কামিনীগন স্বর্ণরৌপ্যের হাতকড়ি না পাইয়া কাচের চুড়ি পরিয়া দাসী-জীন সার্থক করে। যে (বিধবা) চুড়ি পরিতে অধিকারিনী নহে তাহার মত হতভাগিনী যেন এ জগতে নাই! অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূচক গহনাও ভাল লাগে। অহিফেন তিক্ত হইলেও আফিংচির অতি প্রিয় সামগ্রী। মাদক দ্রব্যে যতই সর্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহেনা।সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি-গর্ব্বে স্ফীতা হই! "

এখন আসি, বর্তমান এই উচ্চশিক্ষা এবং বাইরে জব আসলেই নারীকে মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছে কিনা! পূর্বে আয়ের সোর্স কেবল পুরুষরা ছিল তাই তাদের পরিবারে ও সমাজে আলাদা একটা মর্যাদা ছিল। যেহেতু নারীদের আয়ের সোর্স ছিলনা তাই তারা নিগৃহিত ছিল ঘরে। কিন্তু এখন? নারীদের উচ্চশিক্ষা আছে, উপার্জন করছে। তারা এখনও নিগৃহিত হচ্ছে ঘরে এবং ঘরের বাইরে। কিভাবে??
আমি যখন দেখি ইউনিভার্সিটি তে পড়া মেয়েরা যারা পড়াশুনা করছে কেবল জবের উদ্দেশ্যে তারা অবসর সময়ে শপিং করতে খুব ভালবাসে, হিন্দি সিরিয়ালে কে কি ড্রেস পড়ল, কে কি গহনা পড়ল, কি কিভাবে সাজল সেটা নকল করতে ভালবাসে। কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজেদের পণ্য করতেও দ্বিধা বোধ করেনা। শেভিং ক্রিম থেকে শুরু করে এমন কোন প্রোডাক্ট নেই যেখানে নারীদের পণ্য করা হচ্ছেনা। টিভিতে বিজ্ঞাপনে এই আধুনিক যুগেও যখন নারীদের দেখানো হয় টিপিক্যাল সেই সংকীর্ণ চিন্তা ভাবনা দিয়ে, যেখানে একজন নারী পাশের মহিলার সুন্দর গহনা,শাড়ি দেখে নিজের হাজবেন্ডের সাথে ঝগড়া বাধায়, যেখানে একজন নারী সাবানের মডেল হয় কোমল ত্বকের অধিকারী হবার জন্য যা হাজবেন্ডের মন যুগাবে সেখানে আমি কিভাবে বলব নারীর তথাকথিত উচ্চশিক্ষা ও বাইরে জব তাদের মুক্তি দিয়েছে, তাদের সত্যিকার মর্যাদা দিয়েছে, তাদের কে সফল ক্যারিয়ারিস্টিক নারী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে?

আমি কেবল নারীকে তার ভ্রান্ত চিন্তা-বিশ্বাস থেকে উঠে আসতে বলেছি। বলেছি পুরুষের মত অনুকরণে নয়, পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে নয় বরং নারীর মুক্তি আসবে নারীর স্বাতন্ত্রে। নারী তার নারী সত্তা দিয়ে নিজেকে পূর্ণরূপে বিকশিত করতে পারবে। সন্তান ধারণ করা নারীত্বের সবচেয়ে সাফল্যময় দিক, সন্তানকে পালন করা তার ক্যারিয়ারের একটা মূল্যবান সাইড। যারা বাইরে জব করেনা তারা যেন মনে না করে তাদের উচ্চশিক্ষা সব বিফলে গেল, কারণ এখন সন্তান কে ভবিষ্যত পৃথিবীর জন্য তৈরি করা উচ্চশিক্ষা ছাড়া সম্ভব না। নারীকে ভাবতে হবে, শিক্ষা কেবল আয়ের উৎস নয় বরং নিজেকে মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির অনন্য উপায়।

আহমাদ মুসাফফা, নাজমুসসাকিব নির্ঝর,সত্য কন্ঠ ও শিহান মির্জার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরছি......

আহমাদ মুসাফফা ভাইয়া প্রশ্ন করেছেনঃ


মেয়েদের চাকুরী না করতে বলা হলে কিছু ethical প্রশ্ন আসতে পারে । যেমনঃ
১.আমার ক্লাসের মেয়েরা আমার মতই কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করছে । এখন তাদেরকে যদি চাকুরী না করতে বলা হয় তাহলে সেটা কি অবিচার হবে না?
২ সন্তান পালন করাই যদি আসল কাজ হয়ে থাকে তাহলে এত কষ্ট করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নামিদামি ভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হওয়াতে স্বার্থকতা কোথায়?
৩ মেয়েরা মেধায় কম যায়না । যেমন আমাদের ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড দুইজনই মেয়ে । ক্লাসের অন্য মেয়েরাও খুব ভাল । তারা কি ছেলেদের মত কম্পিউটার প্রোগ্রামার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেনা?

জবাবঃ
# নাজমুসসাকিব নির্ঝর ভাইয়া জবাব দিয়েছেন এইভাবে,


"পুরা ব্যাপারটার শুরু কোথায়? ব্যাপারটার শুরু হয়েছে একটা ডিপলি রুটেড আন্ডারভ্যালুয়েশন থেকে। যেসমাজের পুরুষ এবং নারী উভয়েই ঘরের সেই ছেলের বউ কে খুব দাম দেয় যে বড় চাকরী করে। আর যে বউটা বাসায় থেকে ঠিক মত ছেলে মেয়ে গুলোকে "মানুষ" করে তাকে অবহেলা করে। অথচ তারা জানেনা যে দ্বিতীয় কাজটা লিটারেলি এবং মেটাফরিকালি কি প্রচন্ড রকমের প্রয়োজনিয় কাজ। দ্বিতীয় কাজটা হচ্ছে একটা কন্ট্রিবিউশন টু এন্টায়ার সিভিলাইজেশন।
একজন যথার্থ সুশিক্ষিত মায়ের অভাবই একটা বাচ্চাকে অমানুষ বানাইতে যথেষ্ঠ। এবং আমরা আজকের যে পশ্চিমকে দেখছি এই পশ্চিমের তরুনদের অনেকেই এসেছে এইরকম ক্যারিয়ারিস্ট মা’র কাছ থেকে। তাদের বেড়ে ওঠার উপর এর একটা সাংঘাতিক প্রভা...ব আছে। তুই চিন্তা কর, একদম ছোট বেলায় যদি মা বাসায় না থাকত তাইলে আমরা কী করতাম? ৫০ বছর আগের পশ্চিম এর ক্ষেত্রে হয়ত এরকম মা’র কাছ থেকে আসা সন্তানের সংখ্যা ৩০% বা আরো কম ছিল। সেসময় অপরাধপ্রবনতাও আরো কম ছিল। হয়ত এই কোরিলেশনটা টু মাচ সিম্পলিস্টিক হয়ে গেল। কিন্তু পশ্চিম স্বীকার করুক আর নাই করুক নিঃসন্দেহে এটা সবচাইতে ইম্পর্টেন্ট ফ্যাকটর গুলোর একটা।

মির্যা গালিব ভাইয়ের ফেমিনিসম বিষয়ক একটা সাম্প্রতিক বক্তব্যের কথা বারবার মনে পড়তেছে, তিনি বলেছিলেন মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া ফেমিনিসম এর প্রতিরোধ সম্ভব না। মুখে খুব ইসলাম ইসলাম করা আর বাসায় যেয়ে বউকে বলা যে "আরে তোরে খাওয়াই আমি তুই কথা শুনবিনা কেন"? এইটাই ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট এর মোমেন্টাম হিসাবে যথেষ্ট। তিনি আরো বলেছিলেন, যদি মা'র কন্ট্রিবিউশন টা যথাযথ স্বীকৃতি পাইত তাইলে খুব কম মেয়ে (লেখিকার ভাষায় সুপার উইমেন) পাওয়া যাইত যারা এই রোদ্রের মধ্যে নিজের ইচ্ছায় বাসে ঝুলে অফিসে যাইতে চাইত।"



শিহান মির্জা জবাব দিয়েছে এইভাবে,


"প্রশ্নগুলো/আপত্তিগুলো apparently খুব শক্তিশালী। কিন্তু, এগুলো scrutinize করলে এগুলোকে refute করা সম্ভব।
১) বর্তমান দুনিয়াতে পড়াশোনা করার পিছনে যে মাইন্ডসেট কাজ করে তা হচ্ছে ভালো একটা জব পাওয়া, ভালো জীবিকার ব্যবস্থা করা এবং পারলে খ্যাতি অর্জন করা। এখন কথা হচ্ছে, এই কারণগুলো আসলেই জ্ঞানার্জনের পিছনে যে মূল Ethical Reason (i.e. To serve Humanity [from secular perspective] or to serve Islam [From an Islamic perspective])থাকার কথা সেগুলোর খিলাফ কিনা তা ভাবার সময় আসছে। কম্পিউটার সাইন্সের জ্ঞান শুধু জবেই কাজে লাগতে পারে, এর বাইরে কাজে লাগতে পারে না সেটা মনে হয় ঠিক না। উম্মাহকে সার্ভ করার জন্য এর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অর্জিত জ্ঞানকে কিভাবে তাদেরকে তাদের মূল কর্তব্য থেকে না সরিয়ে ব্যবহার করা যায় সেটা ভাবতে হবে।

২) সন্তান লালনপালন করার জন্য সুশিক্ষিত মায়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক অনেক বেশী। একটা সন্তানের কাছে ৫ম শ্রেণী পাশ করা মায়ের চাইতে মেডিকেল/ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী নেয়া মায়ের প্রভাব অনেক বেশী থাকবে। সন্তানের সাথে Understanding এর ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় শ্রেণীর মায়েদের সফলতা অনেক বেশী থাকবে। তাছাড়া সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে যে প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সেটাও দ্বিতীয় শ্রেণীর মায়েরা বেশী বোঝার কথা কেননা তারা নিজেরাও শিক্ষিত। সুতরাং উচ্চশিক্ষা অর্জন শুধুমাত্র নিজের স্বার্থোন্নতির জন্য নয়। বরং, উচ্চশিক্ষা অর্জন মুসলিম নারীদের তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করার Potential অনেক বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা যায়।

৩) এর জবাব ১ এবং ২ নং পয়েন্টে পাবেন।"


রেইন স্পট জবাব দিয়েছে এইভাবে,


"আসলে কি জানেন, আমাদের মেয়েদের মধ্যে একটি বিশ্বাস জন্মে গিয়েছে যে পড়ালেখা যখন শিখেছি তখন অবশ্যই জব করতে হবে। আমি নিজে মেয়ে হয়ে কিন্তু মেয়ে...দের বাইরে জবের বিরুদ্ধে কথা বলিনা। যেটা বলি সেটা হল উচ্চশিক্ষা কখনও বাইরে জবের জন্য না বরং জীবনে প্রয়োগের জন্য। এখন একটি মেয়ের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট ফিল্ড হল তার সংসার & সন্তান। কারণ এই সন্তান ধারণের ব্যাপার আল্লাহ পুরুষকে দেননি, তারমানে অবশ্যই মেয়েদের এইদিকে এক্সট্রা কন্সার্ন দিতে হবে। কখনও যদি এরকম হয় আমার বাইরে জব আমার সংসার ও সন্তানের জন্য কনফ্লিকশান হচ্ছে তাহলে অবশ্যই সংসার ও সন্তানকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমি নিজে মেডিকেলে পড়ছি, আমাকে বাইরে জব করতে হবে, কিন্তু অবশ্যই আমি আমার সংসার ও সন্তানের সাইডটা প্রাধান্য দিব আগে। কারণ আমার শিক্ষা যে কেবল বাইরে জব করেই প্রয়োগ করতে হবে এমন নয়, আমার সন্তান,পরিবার,আত্বীয়স্বজন,প্রতিবেশি এদের মধ্যেও প্রয়োগ শিক্ষা প্রয়োগ করা যায়। এখন সন্তান পালন করাকে যতটা সহজ কাজ বলে নারীরা মনে করছে ব্যাপারটা ততটা সহজ না। আগে হয়ত মায়েদের উচ্চশিক্ষা না হলেও চলত কিন্তু এখন এই সন্তানের জন্যই উচ্চশিক্ষার দরকার আছে। চাইল্ড সাইকোলজি বুঝে ফিউচার জেনারেশানকে লিড দিতে হলে ঘরে একটি মেয়েকে কতটা ডাইনামিক হতে হবে এটা বুঝলে মেয়েরা এখন আর বাইরে জব নিয়ে মাতামাতি করতনা। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সেটা নিরঝর ভাইয়া উল্লেখ করেছে, মেয়েদের এই বাইরে বের হবার আন্দোলনের ইন্ধন যুগিয়েছে পুরুষরা। কারণ তারা যদি মেয়দের ঘরে সংসার ও সন্তান পালনের জন্য আন্ডারএস্টিমেইট না করত তাহলে নারী আন্দোলনের এই তথাকথিত কনসেপ্ট আসতনা। যাইহোক আমি আশাবাদী এই পুরুষরা যদি এখন নারীদের উপযুক্ত সম্মান ও অধিকার ঘরেই দেয় তাহলে উচ্চশিক্ষিত নারীরাই আমাদের ভবিষ্যত জেনারেশান কে লিড দিবে।"


আহমাদ মুসাফফা ভাইয়ার প্রশ্নঃ
যদি এটাই মনে হয় উচ্চশিক্ষা জবের জন্য না তাহলে একটা ethical প্রশ্নও উঠে আসতে পারেঃ
মেয়েরা কি তাহলে পাবলিক ভার্সিটি, মেডিকেল কলেজে আসন নষ্ট করছেনা? অন্যছেলেদের কথা নাই বা বললাম হাজার হাজার A+ গ্রেডধারী ছেলেও উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য ভর্তি হতে পারছেনা । জবই যদি মেয়েরা না করল তাহলে এইসব ছেলেদেরই বা কেন বঞ্চিত করল?

রেইন স্পটের জবাবঃ
"অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু আমি এটা বলিনি যে উচ্চশিক্ষা করেও সব মেয়েরা ঘরে বসে থাকবে। আমি বলেছি উচ্চশিক্ষা মানেই জব না। আর সন্তান পালনের জন্য তারা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকবে ব্যাপারটা তাও না। আমি যেটা ফিল করি সেটা হল ...প্রতিটি বাচ্চার জন্য একটা টাইম পিরিয়ড থাকে যখন মায়ের সংস্পর্শে থাকাটা অনেক জরুরি। এরপর সেই টাইম পিরিয়ড কমে যায়, তখন বাইরে জবের সাথে সন্তান পালন খুব একটা বৈপিরত্য হয়না। এসব আসলে সিচুয়েশান বুঝে এনালাইসিস করার মত প্রশ্ন। আপনি যদি কোন কেইস আমাকে বলেন তাহলে সেভাবে চিন্তা করে এন্সার দেয়া যাবে। তবে অবশ্যই যে ব্যাপারটা সর্বদা প্রাধান্য সেটা হল সন্তান প্রতিপালন। কারণ একটি পুরুষের যেমন ফিনান্সিয়াল রেসপন্সিবিলিটি সবার উপরে তেমনি একটি মেয়ের সন্তান প্রতিপালন সবার উপরে। এন্সার ক্লিয়ার না হলে, প্লিজ আমাকে একটি কেইস বর্ণনা করে প্রশ্ন করেন, তাহলে হয়ত সেভাবে এন্সার দেয়া ইজি হবে।"

আহমাদ মুসাফফা ভাইয়ার প্রশ্নঃ
মানুষের মনমস্তিষ্ক এমন এক জিনিস যে চর্চায় না থাকলে সে আসতে আসতে সে সব ভুলতে শুরু করে । সেটা মেডিকেল বলেন আর কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-ই বলেন । বিয়ের পর একটি মেয়ে যদি ৫-১০বছর তার সাবজেক্টে চর্চা না করে তাহলে সে আগে যা শিখেছিল তার বেশিরভাগই ভুলে ...যাবে । তারমানে সে এত কষ্ট করে যা শিখলো তা "লস্ট প্রজেক্ট" ভিন্ন কিছু হবে না বলে আমার বিশ্বাস ।
এখন আমার চতুর্থ প্রশ্নের দিকে খেয়াল করুন । এখন দেখতে পাবেন ঐ মেয়ে সম্ভাবনাময় একটি ছেলেকে ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার/ইকোনোমিস্ট হতে দেয়নি । না সে নিজে হতে পারল না অন্যকে হতে দিল ।
.........

সত্য কন্ঠের জবাবঃ
আমার মনে হয় রেইন আসলে বুঝাতে চেয়েছে জব করাটা মেয়েদের ফার্স্ট টার্গেট হওয়া উচিৎ না,কিন্তু কেউ করতে চাইলে ও তাকে বাধাও দিচ্ছেনা।যেমন আমি......আমার ডিটারমাইন্ড ইচ্ছে আমি জব করবোনা।সেই ধরণের কোন টার্গেটই নাই আমার।কয়েকটা কারণ আছে এর।প্রথমত আল্লা...হ আমাকে অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত দিয়েছেন।আল্লাহ আমাকে যা থেকে মুক্ত দিয়েছেন তা আমি আমার উপর চাপিয়ে নিব নিজের উপর এতোখানি জুলুম কিংবা বোকামি আমি করবনা(বাধ্য হলে ভিন্ন কথা)।আমি বাইরে বের হয়ে পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে বাসের ভীরে ধাক্কাধাক্কি করে ৯টা-পাচঁটা অফিস করে আমি আমার সম্মান বাড়াতে চাইনা(বাসের ভীরে ধাক্কাধাক্কি না করতে হলেও বাইরের পরিবেশ একটা মেয়ের জন্য কতোখানি প্রতিকুল সেটা মেয়ে মাত্রই জানে)।আমার সম্মান আল্লাহ এমনিতেই অনেক বেশী দিয়ে রেখেছেন।আমি কন্যা,আমি স্ত্রী,আমি মা।এ সম্মানের তুলনা কোন কিছুর সাথেই হয়না।আমাকে কেন সম্মানের জন্য কর্ম ক্ষেত্র খুজেঁ নিতে হবে???আমার কর্ম ক্ষেত্রতো আল্লাহই ঠিক করে দিয়েছেন গৃহকে।আমার সম্মান আমার গৃহে।তবে হ্যাঁ,কেউ যদি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একটা ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাকে আমি নিষেধও করিনা।আমার ছোট বোন স্বপ্ন দেখে একটা সফল ক্যারিয়ারের।আমি তাকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে বলি।কিন্তু নিজের জন্য গৃহ ছেড়ে আমি নতুন কর্ম ক্ষেত্র খুজঁবনা কখনোই।আমার মনে হয়েছে রেইন এটাই বলেছে।ও কাউকে বাধ্য করছেনা ক্যারিয়ার না গড়ার জন্য।অনুপ্রানিত করছে আল্লাহ নারীদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন সেটা যথাযথভাবে পালন করার জন্য আর আল্লাহ যে সম্মান দিয়েছেন সেটাকে মূল্যায়ণ করার জন্য।

শিহান মির্জার জবাবঃ
ভাইয়া আপনি ঠিকই বলেছেন। কোন কিছু চর্চায় না থাকলে মানুষ তা ভুলে যায়। আসলে, এখানে কেউই বলেনি যে, কোন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট মা বা কম্পিউটার প্রোগ্রামার মা তার সন্তান লালনপালনের জন্য তার স্কিলটার চর্চা বাদ দেবেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ...হচ্ছে, নিজের অর্জিত শিক্ষার প্র্যাকটিক্যাল ইমপ্লিমেন্টেশন ফিল্ড কেন শুধু জবকেই ধরা হবে? আপনি একটিবার চিন্তা করুন, ধরুন কোন এম বি বি এস পাশ করা মা যদি নিজের ঘরেই একটা ছোট ক্লিনিক খুলে এলাকার গরীব মহিলাদের বিনা চিকিৎসায় ট্রিটমেন্ট দেয় কিংবা, কোন প্রোগ্রামার মা যদি ঘরে বসে নিজের স্কিলকে কাজে লাগিয়ে, ঘরে বসে পড়াশোনা করে একটা এন্টিভাইরাস সফটওয়্যার তৈরী করার চেষ্টা করে, সেটা কি তার সন্তান লালনপালনে খুব একটা ব্যাঘাত ঘটাবে? তাছাড়া অনেক ইসলামিক স্কলারই বলেছেন যে, আধুনিক কোন ইসলামী রাষ্ট্রে যে দুটি ফিল্ডে মেয়েদের সবচেয়ে বেশী জড়িত হওয়া দরকার তার একটি হচ্ছে ডাক্তারী পেশা অপরটি হচ্ছে শিক্ষকতা।
আর কোন ছেলে যদি ইউনিতে/মেডিকেলে চান্স না পায় সেটা কি মেয়েটার দোষ নাকি ছেলে আর সরকারের দোষ?


আহমাদ মুসাফফা ভাইয়ার প্রশ্নঃ
আপনি যখন "নারীর প্রকৃত ক্যারিয়ার কি হবে" এমন বিষয়ে লিখবেন তখন আপনাকে নারীর ব্যাপারে
১ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কি হওয়া উচিত,
২ শিক্ষাব্যবস্থাকে নারীর উপযোগি করে কিভাবে ঢেলে সাজাতে হবে,
৩ আধুনিক নারীর চাওয়া পাওয়া নিয়ে আপনার মূল্যায়ন,
৪ ইনফরমেশন ট...েকনলজি যেভাবে সামাজিক বাধা দূর করে দিয়ে তথ্য আদান প্রদানকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সেই গ্লোবাল ভিলেজে নারীর ভূমিকা কি
সহ আরো অনেক বিষয়ে আপনাকে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দিতে হবে ।

মনে রাখবেন, নারী সমাজে বেগম রোকেয়া কথাগুলো রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করা হয় । "পুরুষ মেজিস্ট্রেট হতে পারলে আমরা কেন লেডি মেজিস্ট্রেট হতে পারবনা" এর স্থলে আপনি নারীদের হয়ত বাসায় থাকতে বলবেন । আবার আপনি যদি এও বলেন যে পাঁচ থেকে দশ পর চাকুরী করতে সেটা কতটুকু যৌক্তিক সেটা বিবেচনায় রাখবেন আশা করি ।
আপনি কি বেগম রোকেয়ার বইগুলো পড়েছেন?


রেইন স্পটের জবাবঃ নারীর প্রকৃত ক্যারিয়ার কি হবে সেটা আমার এই পোস্টেই স্পষ্ট বলা আছে। আপনার বাকি প্রশ্ন ডিসকাশনের আরো দিক উন্মোচন করবে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত ক্যারিয়ার এর ব্যাপারে আল্টিমেইট এন্সার সেইম। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি,শিক্ষাব্যবস্থা, আধুনিক নারীর চাওয়া-পাওয়া, ইনফরমেশান টেকনোলজি সবকিছুই এখন নারীরে প্রতিকূলে। কারণ নারীরা এখন যে আইডিয়া তে আধুনিক হচ্ছে, বা যে আইডিয়াতে আমাদের সেকুল্যার সমাজ নারীকে আধুনিক করতে চাইছে সেটাকে পরিবর্তন করা বা কিরকম হওয়া উচিত সেটা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নাই, আমি আসলে আধুনিক নারীদের কিছু চিন্তা ভাবনার ভুল সাইড টা নক করতে চাইছি। কারণ নারীরা যদি সমাজের চাওয়া-পাওয়ার পুতুল হয়ে থাকে, যদি তারা নিজেদেরকে সমাজের এক্সপেকটেশান অনযায়ী আধুনিক হয় কোনদিন তাদের মুক্তি আসবেনা। তাদের মুক্তি আসবে তাদের ভ্রান্তি আইডিয়া যদি সংশোধিত হয় তবেই। আমি কেবল ওই ভ্রান্তি আইডিয়ার দিকেই ফোকাস করছি।

বেগম রোকেয়া নারী মুক্তি নিয়ে সামান্য কিছু জিস্ট আজকের পোস্টে দিলাম। ইচ্ছা আছে বেগম রোকেয়ার নারী কেন্দ্রীক চিন্তা ভাবনা নিয়ে আরো পোস্ট দিব।

(বিশেষ কৃতজ্ঞ নির্ঝর, মুসাফফা ভাইয়া, শিহান ও সত্য কন্ঠের প্রতি এবং দুঃখিত এত বড় পোস্টের জন্য)

সফল ক্যারিয়ারিস্টিক নারী !

নারী শিক্ষা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহনের ফলে দেশ, জাতি এবং নারী সমাজের উন্নতি হইলেও পুরুষ সমাজ মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হইতেছে। নারী তো পাষাণী। স্বামী বিরহের চেয়ে অর্থোপার্জনপূর্বক আত্মপ্রসাদলাভই তাহার জন্য পছন্দসই। অথচ এই প্রিয়া বিরহ পুরুষকে শয়নে-স্বপনে-অফিসে-মিটিং এ একদন্ড শান্তিতে থাকিতে দেয় কিনা সন্দেহ। আবার যদি এমন হয়ত যে অর্থোপার্জন এমন স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ পুরুষের জন্য ধর্মীয় ও নীতিগতভাবে বাধ্যতামূলক নহে, তবে হয়ত অধিকাংশ পুরুষই স্ত্রীর কাছাকাছি থাকিত
http://www.rtnn.net/details.php?id=29085&p=1&s=27

লাইনগুলো কোট করেছি একটি অনলাইন ধারাবাহিক উপন্যাস থেকে। সমাজে নারীর বর্তমান অবস্থান নিয়ে চিন্তা করছিলাম। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। পূর্বে নারীদের শিক্ষা ছিলনা,আয়ের স্কোপ ছিলনা কেবল ঘরের কাজ আর সন্তান পালনেই নারীরা আবদ্ধ ছিল বলে পুরুষের মত গুরুত্ব সমাজ দিতনা। তাই অনেক এনালাইসিস করে নারীরা চিন্তা করল শিক্ষিত হতে হবে, বাইরে জব করতে হবে, উপার্জন করতে হবে...তবেই নারীর মুক্তি। কিন্তু কেবল এই চক্রেই নারীরা থেমে থাকেনি, পুরুষের থেকে কিসে কম তারা? পুরুষরা যে কাজ করে সেখানেও নারীদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য তারা এমন কোন ক্ষেত্র নাই যেখানে এখন বিচরন করছেনা। চিকিৎসক,ইঞ্জিনিয়ার,জজ,ব্যারিষ্টার ই কেবল নয় আর্মি,পুলিশ,পাইলট সবখানেই নারীর আজ সদর্পে পদার্পন। কিন্তু নারী কি আজ সত্যিই স্বাধীন?

নারীরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছে। এজন্য কিসের স্বাধীনতা কিংবা কিসের সাথে তাল মিলিয়ে আসলে তারা নিজেদের কিভাবে সম্মানিত করতে চাইছে সেটা তারা নিজেও বুঝতে পারছেনা। নারী-পুরুষের অধিকার কখনও এক অপরের সমানে নয়, বরং স্বাতন্ত্রে। পুরুষের মত পোশাক পরলেই, পুরুষের সাথে কাজ করলেই নারী তার প্রাপ্য অধিকার কখনও পাবেনা।

নারী সমাজের উন্নতির জন্য যদি নারীরা তাদের আসল অধিকার কোথায় এবং সেটা কিভাবে পাওয়া সম্ভব সেটা যদি স্টাডি করত তাহলে বুঝতে পারত বর্তমান পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব,হতাশা, সন্তানের অন্ধকার ভবিষ্যতের জন্য নারীর এই তথাকথিত মডার্নাইজেশান দায়ী।

পাশ্চাত্য উন্নত বিশ্বে নারীদের সাথে মুসলিম নারীরা যদি তাদের তুলনা করতে যায় তাহলে প্রথমেই যে ভুলটি হবে সেটা হল আইডিওলোজিতে। পাশ্চাত্য নারীরা প্রচন্ড পরিমান বস্তুবাদি জীবন যাপনে বিশ্বাসী। তাদের কাছে যেহেতু সৃষ্টিকর্তার কোন ধারণা নাই সেহেতু তাদের উন্নতির অন্যতম ইউনিট হচ্ছে পুরুষ। পুরুষকে অনুসরন করাই তাদের উন্নতি এবং আধুনিকতার ইউনিট। এজন্য তারা পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে উন্নত ও আধুনিক হচ্ছে। এবং এতে করে তারা নিজেদের খুব সম্মানিত মনে করছে। তারা মনে করছে নারীরা এখন আর সন্তান উৎপাদনকারী নয়, তাই তারা সন্তানের দায় দায়িত্ব নেয়াকে নারীত্বের অবমাননা মনে করছে। ফলস্বরূপ মা-সন্তানের সম্পর্ক খুব শিথিল হয়ে পড়ছে, কেউ কারো কাছে দায়বদ্ধ না। সন্তানেরা এক গভীর সাইকোলজিক্যাল ট্রমাতে ভুগছে।

আমাদের দেশে কি ঘটছে এখন? খুব খুউব নিরাপদ সম্পর্কও এখন প্রশ্নের সম্মুখিন। সন্তানের হাতে মা কিংবা মায়ের হাতেই সন্তান খুন। পরকীয়ার জন্য একজন মা তখন কেবলই এক ক্রেজি নারী হয়ে উঠছে, সন্তানের কাছে তার 'মা' আইডেন্টিটিও তখন কেবল কর্পুরের মত বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অনেক আগেই প্রশ্নবিদ্ধ, এখন সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের সম্পর্কও প্রশ্নবিদ্ধ। হুম, সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশও এগিয়ে যাচ্ছে। নারীরা এখন অনেক স্বাধীন,মুক্ত। তারা এখন আর কোন কিছুর পরোয়া করছেনা। নিজের অধিকার আদায়ে কোন সম্পর্ককেও আর গুরুত্ব দিচ্ছেনা। যদি পাশ্চাত্যকে আদর্শ ধরা হয় তাহলে নারীর এই স্বাধীনতা, এই মুক্তি, এই উন্নতি, এই আধুনিকতা সবকিছু নারীর উন্নতির স্পষ্ট সাইন।

কিন্তু ইসলামে নারীকে সর্বোচ্চ যে অধিকার দিয়েছে সেটার বিচারে নারীরা আজ কতটা স্বাধীন,সম্মানিত ও আধুনিক সেটা বিচার করি। নারী যদি নিজেদের অধিকার ও সম্মান আদায় করতে চায় তাহলে সেক্ষেত্রে নারীদের আদর্শ ধরতে হবে সেই সৃষ্টিকর্তাকে যিনি নারীকে সৃষ্টি করেছেন। রাসূল (সাঃ) এর সেই দুইটি হাদীস যেখানে বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। আর সেই ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে যখন নবীজী(সাঃ) পরপর তিনবার মায়ের সেবার পর বাবার সেবার কথা বললেন তখন কিভাবে বলব যে ইসলাম নারীর সম্মান দেয়নি, অধিকার দেয়নি?

বর্তমান নারীরা অনেক বেশি সম্মান অর্জন করতে গিয়ে তাদের আসল সম্মানের জায়গাতে নিজেদের হিউমিলিয়েট করছে। তারা সুপার উইম্যান হতে চায়। একজন সফল ক্যারিয়ারিস্টিক নারী, সফল মা, সফল স্ত্রী, সফল হোমমেকার....সবকিছুতেই সফলতা অর্জন করতে গিয়ে নিজেদের উপর নিজেরাই বার্ডেন বয়ে আনছে। ক্যারিয়ারিস্টিক হওয়া মানেই পুরুষের মত হওয়া নয়, ক্যারিয়ারিস্টিক হওয়া মানেই পুরুষকে সফল ক্যারিয়ারের ইউনিট মনে করা নয়। ক্যারিয়ারিস্টিক হওয়া মানেই সন্তান জন্ম দেয়া ও পালন করা নারীত্বের অবমাননা নয়।
একজন নারী সফল ক্যারিয়ারিস্টিক, সফল মা, সফল স্ত্রী, সফল হোমমেকার হতে পারে যদি এই সফলতার ইউনিট মৃত্যুর পরের জীবনকে কেন্দ্র করে হয়। একজন নারী যদি তার পায়ের নিচে জান্নাতকে বাদ দিয়ে বস্তুবাদি সভ্যতা আর ক্যারিয়ার নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে সে ক্যারিয়ারিস্টিক হতে পারলেও একজন সফল মা,স্ত্রী ও হোমমেকার হতে পারবেনা কখনও। আর যে সন্তান তার জান্নাত খুজে পাবে তার মায়ের নিচে সেই মা যদি সন্তান পালন করাকে নারীত্বের অবমাননা মনে করে তাহলে নারীর উন্নতি কেবল এই স্বপ্নময় জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, মৃত্যু পরবর্তী অসীম বাস্তবতার জীবনে সবকিছু হবে শূন্য।

তাই পাশ্চাত্যের মত উন্নতি করতে গিয়ে মুসলিম নারীরা যদি পুরুষের মত সমান হওয়াকে আদর্শ ধরে তাহলে কাংখিত উন্নতি কখনই আসবেনা। সমাজে এক গভীর ক্ষত তৈরি হবে, আজকের সন্তানেরা বড় হবে নিরাপদহীন পৃথিবীতে, তারাই ভবিষ্যতে আরো গভীর ক্ষত তৈরি করে দিয়ে যাবে এই সমাজের বুকে। যেখানে সন্তানেরা তাদের মায়ের মাঝে খুজে পাবেনা তাদের জান্নাত সেখানে তারা কি শান্তি আনবে ভবিষ্যত সমাজের জন্য?

একজন শিক্ষিত নারী যদি বাইরে জব নাও করে তার সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ জব করতে হয় ঘরের ভিতরে। একজন নারী ঘরে বসে বিশ্ব পরি্চালনায় অংশগহন করে। এই বিশ্ব পরিচালনার কাজ নিশ্চয় এত সহজ না যতটা একজন নারী ভাবে! আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। আগামী ভবিষ্যতের দায়ভার একজন নারীকে নিতে হয়, কোন পুরুষকে নয়। তাদের পারিবারিক আবহে সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া, মানসিক ও শারিরীক বিকাশে ভূমিকা রাখা ইত্যাদি এসব কাজের জন্য যদি কোন প্রতিষ্ঠান খোলা হয় আমি নিশ্চিত পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ও প্রেস্টিজিয়াস প্রতিষ্ঠান হবে সেটা। একটা শিশুর মনে মায়ের প্রভাব কিভাবে বিস্তার করে সেটা নিয়ে গবেষণা করলে সেই গবেষণার পেপার এতখানি গুরুত্ব পাবে পুরা বিশ্বে যে সবাই একথা
একবাক্যে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবে যে এক মায়ের জন্যই পুরা পৃথিবী টিকে আছে। একথা আমি হলফ করে বলতে পারি কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক একজন সন্তানের জন্য নারীকে জান্নাতের পথকে সুগম করে দেবার কাজ পৃথিবীর হাজার শ্রেষ্ঠ কাজের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

সবকিছুর শেষে প্রতিটি নারীকে আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয়, নিশ্চিত জান্নাতের মত উন্নতির পথ ছেড়ে কেন আপনারা একেবারে মূল্যহীন আধুনিক হবার প্রতিযোগীতায় নেমেছেন? আমাকে যদি অপশন দেয়া হয় তাহলে আমি সফল মা হয়ে ,পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাতকে নিজের জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার হিসাবে বেছে নিব এবং সেভাবেই চেষ্টা করব। কারণ আমার ইউনিট ম্যাটেরিয়ালিস্টিক স্বপ্নীল পৃথিবী নয়, আমার ইউনিট অসীম বাস্তব জীবনে জান্নাত পাবার সার্থকতা। সেক্ষেত্রে একজন নারী হিসেবে এরচেয়ে সফল নিশ্চিত ক্যারিয়ার নারীরা আর কোথায় পাবে?

স্বপ্নময় জীবন !

দূর্গম পাহাড়ের উপর দিয়ে হাটছিলাম। কিন্তু কোন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না কোথায় যাব। আমি একা না, সাথে আমার কিছু বন্ধুরাও ছিল। কিন্তু তারা যে কোথায় হঠাৎ উধাও হল বুঝতে পারছিনা। পশ্চিম আকাশ ধীরে ধীরে লাল হয়ে আসছে, তার মানে সূর্য ডুবে যাবে। মনের ভিতর ভয় আর শংকা জেগে উঠল। আমি খুব একটা ভীতু মেয়ে না। কিন্তু নাইট ফোবিয়া আছে আমার প্রচন্ড পরিমান। হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখি কয়েকটা অপরিচিত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন জানি! একটু শিহরন লাগে। চিন্তা করলাম, দেরি করে লাভ নেই, এখনি আমাকে দৌড়ে পালাতে হবে। কিন্তু একি? আমার পা যে মাটি থেকে সরছেনা! নাহ! খুব বেশি ভয় পেলে চলবেনা, আমাকে পালাতে হবে। যখন দৌড়াতে দৌড়াতে আমি অনেকদূর চলে এসেছি,ভাবলাম ওই অপরিচিত ছেলেরা আমার আর নাগাল পাবেনা ঠিক তখনি সামনে তাকিয়ে দেখি ম্যজিকের মত তারা যেন কোথা থেকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের মধ্যে প্রচন্ড বড় একটা ধাক্কা খেলাম। পিছনেই তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের একদম শেষ চূড়া। একটু সরে গেলেই ঠিক ১০০ তলা সমান উপর থেকে নিচে গিরিখাদে পড়ে যাব। কি করব? প্রচন্ড ঘামছি। কি করব ভেবে না পেয়ে যখন পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফ দিতে যাব ঠিক তখনি ঘুম ভেঙ্গে গেল..........

যাক! ওটা তাহলে স্বপ্ন ছিল। কি অদ্ভুত স্বপ্ন। আরে বাবা, আমি কেন পাহাড়ে উঠতে যাব? ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি আরে আমি মাত্র দশ মিনিট ঘুমিয়েছি। পড়তে পড়তে কখন টেবিলে ঘুমিয়েছি টের পাইনি। অথচ স্বপ্নে মনে হল আমি যুগ যুগ সময় পার করে এলাম।ভাগ্যিস ওটা স্বপ্নই ছিল!

জীবনটাও কি অদ্ভুত, স্বপ্নের মতই! জীবনের সংগা তাই খুঁজে ফিরি বারবার। জীবনের উদ্দেশ্য কি? এর সার্থকতা কিসে, কিসে ব্যর্থতা? কি ভাল? কি মন্দ? এই তো পাশের বাড়ির রব্বান চাচা,সারাজীবন ঘুস খেয়েছে, অন্যের সম্পদ ফাঁকি দিয়ে নিজে রাশি রাশি টাকার মালিক হয়েছে। এখন তার বাড়ি,গাড়ি সবই আছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। আর জামাল চাচা! সারাজীবন সৎ উপায়ে চাকরি করেছে, কখনও টাকার কাছে নিজের সততা বিকিয়ে দেয়নি। আজ শেষ বয়সে মিথ্যা মামলার আসামী হয়ে জেলে পড়ে আছে। মোটা অংকের টাকা না দিলে নাকি মুক্তি মিলবেনা। আর তার একমাত্র কর্মোক্ষম ছেলেটার নাকি কি জটিল অসুখ হয়েছে, লাখ লাখ টাকা না দিলে নাকি চিকিৎসা হবেনা।

হায়রে জীবন! যে সারাজীবন অন্যের হক নষ্ট করল সেই আজ সুখী। আর যে কষ্ট করে সৎ থেকে গেল আজীবন, সেই অসুখী। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সৃষ্টিকর্তা বলে কি কিছু আছে এই পৃথিবীতে? থাকলে কি সে ন্যয় বিচারক? তাই যদি হয় তাহলে এ কেমন তার ন্যয় বিচার??

যারা বস্তুবাদি তাদের কাছে সৃষ্টিকর্তা বলে আসলে কিছু নাই, কারণ সৃষ্টিকর্তা থাকলে তো আর জামাল মামার মত লোকেরা জীবনে এত কষ্ট ভোগ করতনা। অন্যদিকে রব্বান চাচার মত লোকেরাও আর সুখে থাকতনা। সুতরাং জীবনের সাকসেস মূলতঃ এই জীবনেই। যত বেশি হাই স্ট্যাটাস,যত বেশি গাড়ি-বাড়ির মালিক হতে পারব, তা সে যে উপায়েই হোক না কেন তাহলে আমি সার্থক। কি হবে সৎ থেকে? সৎ থেকে যদি জীবনকে উপভোগ করতে না পারলাম তাহলে সেই জীবনের সাকসেস বলে আর কিছু থাকল?

ভাল কিংবা মন্দের কি আসলেই এবসলিউট কোন সঙ্গা আছে? যে ছুরি দিয়ে একজন খুনি মানুষের গলা কাটে সে খারাপ,মন্দ। আর একই ছুরি দিয়ে যদি ডাক্তার মানুষের গলা কাটে তাহলে সে মহৎ। কি অদ্ভুত। ভাল-মন্দের ইউনিট তাই একেক জনের কাছে একেকরকম। একজন চোরও তার চুরির পক্ষে সাফাই গাইবে। আর জীবনের উদ্দেশ্য? সেটা তো আরো বেশি রহস্যময়।
যে ছেলেটি বিয়ে করার জন্য কেবল সুন্দরী-রূপসী মেয়ে খুঁজে, যার বাবার প্রচুর টাকা আছে, সমাজে একটা স্ট্যাটাস আছে তার উদ্দেশ্য হল বন্ধুদের কাছে নিজের প্রেস্টিজ বাড়ানো, স্ট্যাটাস বাড়ানো। আর যে ছেলেটি বিয়ের জন্য একজন সৎ চরিত্রের মেয়ে খুঁজে যার মেধা আছে, জ্ঞান আছে, যে পারসোনালিটি সম্পন্ন। তার উদ্দেশ্য জীবন চলার পথে শত বাধা আসলেও যেন মেয়েটি তার চরিত্রের আলো দিয়ে, জ্ঞানের মাধুর্য দিয়ে সব বাধাকে অতিক্রম করতে পারে। দু'টি ছেলে, যাদের উদ্দেশ্য দু'রকম। কে জানে কোনটি ভাল? কোনটি মন্দ?

জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে কুরআনে স্পষ্টরূপে বলা হয়েছে, জ্বীন ও মানুষ জাতিকে কেবল আল্লাহর ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে জীবনের সাকসেস সেটাই যা আল্লাহর সান্নিধ্য আনে, ব্যর্থতা সেটাই যা আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কারো কোটি কোটি টাকা যদি তাকে দাম্ভিক করে তোলে, তাকে অন্যায়-অবিচার করার ইন্ধন যোগায়, আল্লাহর স্মরন থেকে গাফেল করে তোলে তাহলে তার সেই কোটি কোটি টাকায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। অন্যদিকে কারো জীবনের চরম দারিদ্য তাকে ধৈর্য্যশীল করে, অসৎ হতে বিবেকে বাধা দেয়, আল্লাহর আরো বেশি কাছাকাছি হবার সুযোগ করে দেয় তাহলে সেই দারিদ্র্যই তার জীবনের চরম সার্থকতা। অন্যদিকে যারা বস্তুবাদি, স্বল্পদৃষ্টির লেন্স নিয়ে জীবনকে দেখে তাদের কাছে জীবনের সাকসেস-ব্যর্থতার হিসাব পুরাই উলটা হবে।

মৃত্যুর পর যখন জেগে উঠব, যখন অপরাধীরা তাদের সকল অপকর্ম দেখতে পাবে তখন তারা চিৎকার করে বলে উঠবে, আমরা তো কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘুমিয়ে ছিলাম মাত্র। অল্প একেবারে অল্প সময়ের জন্য আমরা পৃথিবী নামক গ্রহে বিচরন করেছিলাম। সেখানে কালো টাকার এসি গাড়িতে চড়ে মনে করেছিলাম, এটাইতো জীবন! আমাদের যেন আমাদের পৃথিবীতে ফেরত দেয়া হয় তাহলে আমরা কিছু ভাল কাজ করে আসতে পারি।

স্বপ্নময় এই জীবন। স্বপ্নীল এই জীবনেও সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক। তিনি তো দেখছেন এই স্বপ্নের সামান্য সময়ে কে তার সান্নিধ্য পাবার জন্য অবিরাম কষ্ট করে যাচ্ছে। তিনি তো তার জন্য মৃত্যুর পরে সেই অসীম বাস্তব জীবনে এক বিশাল সুখের সম্ভার নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তিনিই তো ন্যয় বিচারক। আর যে বস্তুগত সুখ নিয়ে সুখি, যে অন্যকে ঠকিয়ে কালো টাকার পাহাড় জমিয়ে খুশি তাকেও তিনি দেখছেন, তার জন্যও তিনি অসীম বাস্তব জীবনে সীমাহীন আযাব নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তার মত ন্যয়বিচারক আর কে হতে পারে?

জীবনের উদ্দেশ্য,সাকসেস, ব্যর্থতা, ভাল, মন্দ এই স্বপ্নীল জীবনের স্বল্প জ্ঞান দিয়ে হিসাব নিকাশ করা যাবেনা। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়ে দুঃস্বপ্নের মতই জীবনটা কে দুর্বিষহ মনে হবে। মনে হবে কত যুগ ধরে আমি স্বপ্ন দেখছি অথচ জেগে উঠার পর মনে হয়ে কয়েক সেকেন্ড কিংবা কয়েক মিনিট। ঘুম থেকে উঠার পর মনে হবে ভাগ্যিস ওটা স্বপ্ন ছিল! স্বপ্নের মধ্যে যত সুখেই থাকিনা কেন জেগে উঠার পর মনে হয় সেই সুখ কিছুইনা। আর যত বিপদেই থাকিনা কেন, ঘুম কেটে যাবার পর খুব স্বস্তিতে থাকি এটা ভেবে যে ওই বিপদ সত্যি ছিলনা।

জীবনটা তাই স্বপ্নময়। জীবন শুরু হবে তখন যখন আমরা মৃত্যুর পরে জেগে উঠব। তখন অসীম সেই মৃত্যু পরবর্তী বাস্তব জীবনের কাছে পার্থিব জীবন খুব বেশি হেয়ালি মনে হবে । যেমন উপরে বর্ণিত স্বপ্নের মতই ঘুম থেকে জেগে উঠার পর আমার মনে হয়েছিল....................

শূণ্য হৃদয় !

হৃদয়কে শূণ্য করতে হবে। পূর্ণ পাত্রে কিছু ঢুকাতে চাইলেও আর ঢুকানো যাবেনা। হৃদয় পবিত্রকরণের জন্য তাই সর্বপ্রথম বিভিন্ন কৃত্তিম বিশ্বাসে পূর্ণ হৃদয়কে শূণ্য করতে হবে। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হল একত্ববাদ বা তাওহীদ। সেই একত্ববাদের মুল ভিত্তি হল হৃদয় শূণ্য করা।

কাউকে যদি ভালবাসি তাহলে প্রথম শর্ত হল ভালবাসার সেই দাবিতে অন্য কারো হক থাকবেনা। সামান্য প্রেমিক-প্রেমিকার ভালবাসায় যদি তৃতীয় ব্যক্তির আগমন ঘটে তাহলে ভালবাসায় ফাটল ধরে। আর যিনি পুরা বিশ্বজাহানের অধিকারি তার প্রতি ভালবাসার নিরংকুশ অধিকারে অন্য কারো দাবি থাকা সাধারণ সেন্সেও অযৌক্তিক লাগে। তাই বান্দার একচ্ছত্র শর্তহীন সীমাহীন ভালবাসার একমাত্র দাবিদার সেই বিশ্বজাহানের মালিক ছাড়া আর কার হতে পারে?

হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে যখন বৃদ্ধ বয়সে তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহ কুরবানি করতে বললেন তখন তো ব্যসিক্যালি আল্লাহ দেখছিলেন ভালবাসা কার প্রতি বেশি। সন্তানের প্রতি নাকি সৃষ্টিকর্তার প্রতি? আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ) এর হৃদয়কে শূণ্য করলেন পার্থিব ভালবাসা থেকে। তাওহীদের বানী গেঁথে দিলেন।

ইসলামের ৫টি মূল ভিত্তির মেইন থিম হল যাবতীয় সকল পার্থিব বিষয় হতে হৃদয় শুণ্য করা। কলেমার প্রথম বাক্য হল কোন ইলাহ নেই। আমাদের কে অনুভব করতে হয় এই জগতে কোন ইলাহ নেই, কোন ক্ষমতাশীল নেই যে এই জগতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আকাশ ও পৃথিবী মন্ডলে এমন কেউ নেই যার কাছে সবকিছু জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের হৃদয় শূণ্য করা হল কলেমার এই প্রথম বাক্য দিয়ে। এরপরই বলা হল, একমাত্র আল্লাহ ব্যতিত। অর্থাৎ কোন ইলাহ নেই একমাত্র আল্লাহ ব্যতিত। হৃদয়কে শূণ্য করেই সেই শুণ্য হৃদয় আল্লাহর একত্ববাদ দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়া হল।ময়লা-আবর্জনা দিয়ে পূর্ণ পাত্র পরিষ্কার করতে হলে সর্বপ্রথম সেই পাত্র খালি করতে হয়। তদ্রূপ ভ্রান্ত বিশ্বাস, পার্থিব আবেগ, মোহ, ভালবাসা সবকিছুকে পিছনে ফেলে কেবল এক আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করতে হয়। এক আল্লাহর প্রতি সমগ্র বিশ্বাস, ভালবাসা,নির্ভরতা দিয়ে হৃদয়কে পূর্ণ করতে হয়।

এরপর নামাজ। এখানেও হৃদয় শুণ্য করতে হয় সর্বপ্রথম। আমি সারাদিনে পাঁচবার যখন আল্লাহকে স্মরন করি তখন আমি যত কাজেই থাকিনা কেন, যত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকুক না কেন সবকিছুকে ইগনোর করে হৃদয়কে কেবল আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতে হয়। পার্থিব সব চাহিদা,প্রয়োজনীয়তা থেকে হৃদয়কে শূণ্য করে সেই এক আল্লাহর প্রতি ভালবাসা দিয়ে হৃদয় পূর্ণ করতে হয়। দিনে হয়ত একবার সময় করে নামাজ পড়লেই হয়ে যেত। কিন্তু ভালবাসার দাবিতে সকাল,দুপুর,বিকাল,সন্ধ্যা,রাত অর্থাৎ সমগ্র দিন-রাতে আল্লাহর প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয়। একত্ববাদ দিয়ে হৃদয় পূর্ণ করার জন্য পাচবার হৃদয়কে শূণ্য করতে হয়।

সাওম বা রোজা। এটা তো হৃদয় শূণ্য করার একদম বাস্তব প্র্যাকটিস। শারীরিক,মানসিক,জৈবিক সব চাহিদা থেকে বিরত থাকতে হয়। ইচ্ছা থাকলেও পারবনা একটিবারের জন্য সামান্য পানি পান করতে। সমগ্র ইচ্ছার অধীন একমাত্র আল্লাহ। তার জন্য ইচ্ছাকে স্যাক্রিফাইস করতে হয়। লুকিয়ে, গোপনে হয়ত অনেক কিছুই করা যায় কিন্তু যখন এটা বিশ্বাস করা হয় যে প্রকাশ্য ও গোপন কোন কিছুই তার অজানা নয় তখন সমগ্র পার্থিব ইচ্ছা দিয়ে পরিপূর্ণ হৃদয়কে রিক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই রিক্ত হৃদয় পূর্ণ করতে হয়।

সম্পদের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা কে যাকাত দিয়ে মিনিমাইজ করতে হয়। সম্পদের প্রতি ভালবাসা ত্যাগ করতে হয়। সেই কিয়ামতের দিন যখন পার্থিব সোনা-রূপা কোন কাজেই আসবেনা তখন এই পৃথিবীতে পার্থিব সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার আর কি মানে রইল? যারা অভাবী, খেতে পায়না দু’মুঠো, এতিম,মিসকিন সবার প্রতি নিজের কষ্টে অর্জিত সম্পদ থেকে ভাগ দিতে হয়। কি এত দায় পড়েছে তাদের আমি যাকাত দিব? কষ্ট করে আমি সম্পদ উপার্জন করেছি। আমার সম্পদে তাদের কেন হক থাকবে? এই পার্থিব সম্পদের প্রতি ভালবাসা পুর্ণ হৃদয়কে পুনরায় শূণ্য করতে হয়। সম্পদের পরিপূর্ণ যাকাত আদায় করে শূন্য হৃদয় আল্লাহর একত্ববাদ দিয়ে পূর্ণ করে নিতে হয়।

বছরে একবার হজ্ব ফরজ করা হয়েছে। আমি অনেক হাই স্ট্যাটাস মেইনটেইন করি। আমার ফ্যামিলি, আমার পড়াশুনা, আমার চাকরি সবকিছুই অনেক বেশি প্রেস্টিজিয়াস। তাই অবশ্যই আমার আর একজন সাধারণ মানুষের সাথে পার্থক্য থাকবে ড্রেসে,গেটআপে, চলাফেরা, কথা-বার্তা সবকিছুতে। হজ্ব আমাদের এই হাই স্ট্যাটাস,সুপিরিয়রিটি সিন্ড্রোমে পূর্ণ হৃদয়কে শূণ্য করে। এখানে সবাইকে এক পোশাকে, একই কাতারে, একই গেটআপে এক আল্লাহর জন্য দাঁড়াতে হয়। কোন ভেদাভদেদ করা যায়না কে সুপিরিয়র কে ইনফিরিয়র। আমাদের হৃদয়কে শূণ্য করা হয় এভাবে যে পার্থিব এই সুপিরিয়রিটি আল্লাহর সুপিরিয়রিটির কাছে কিছুইনা। শুধু মানসিকভাবে কন্ডিশনিং হয় তা নয়। সম্পদের মোহ ত্যাগ করে, পার্থিব সময়ের গুরুত্ব ত্যাগ করে, শারীরিক আরাম-আয়েশের সুযোগকে পিছনে রেখে এক আল্লাহর জন্য অনেক হাই স্ট্যাটাস হওয়া সত্ত্বেও খুব লো স্ট্যাটাসের কারো পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য অনুসন্ধান করতে হয়। হৃদয়কে কত সুচারুভাবে এক হজ্বের মাধ্যমে শূণ্য করে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা দিয়ে পূর্ণ করা হয়।

পার্থিব জিনিসে পূর্ন হৃদয় আল্লাহর ভালবাসা দিয়ে পূর্ণ করা যায়না। এজন্য বলা হয়েছে যারা বিশ্বাস করেনা তাদের যতই শুনানো হোক তারা শুনবেনা, তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে। কারণ তাদের হৃদয় অলরেডি ভ্রান্ত বিশ্বাস,মোহ,ভালবাসা দিয়ে পূর্ণ। একমাত্র তারাই আল্লাহর ভালবাসা , অনুগ্রহ পেতে পারে যারা সেইসব ভ্রান্ত বিশ্বাস, পার্থিব মোহ থেকে হৃদয়কে শূণ্য করতে পেরেছে।

তাওহীদের যে বানী প্রথমেই হৃদয়কে শূন্য করার তাগিদ দিয়েছে তা কেবল বাক্যেই সীমাবদ্ধ থাকেই, বরং একজন মুসলিম তার সমগ্র লাইফে কিভাবে হৃদয় শূন্য করবে তার একটা প্রোটোকলও দিয়েছেন আল্লাহ। দুনিয়া থেকে দুনিয়াবি স্বার্থ যেমন হাসিল হয় তেমনি অপার্থিব স্বার্থও এই হৃদয় শূন্যের মাধ্যমে হাসিল হয়। হৃদয়কে তাই সেই প্রোটোকল অনুযায়ী শূন্য করার চেষ্টা করছি। সেই একমাত্র মহান অধিপতি আল্লাহর দিকেই হৃদয়কে পরিপূর্ণ করার চেষ্টা করছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর একত্ববাদ দিয়ে হৃদয় পূর্ণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

(ইয়াসমিন মুজাহেদ’র আর্টিকেল অবলম্বনে)

হোস্টেল লাইফ-৬

ঢাকায় থাকি বলে সবসময় হোস্টেলে থাকা পড়েনা। তারপরও মেডিকেলে হোস্টেলে থাকাটা কিছুটা বাধ্যতামূলক। তা না হলে পড়াশুনা করা যায়না। আমার তো এখন ভাবতেই অবাক লাগে কিভাবে মানুষ বাসায় থেকে পড়াশুনা করে। হোস্টেলে না থাকলেও এটলিস্ট লাইব্রেরিতে বসে রিডিং পার্টনারের সাথে পড়া ছাড়া আমি বাসায় একা একা পড়াশুনার কথা ভাবতেই পারিনা। সেকেন্ড প্রফ শেষ হল। বলা যায় প্রায় টানা আড়াই মাস হোস্টেলে আছি। মাঝখানে একদিন-দুইদিন করে মাঝে মাঝে বাসায় বেড়াতে যেতাম।

আসলে হোস্টেলে লাইফের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হল মানুষকে চেনা, বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আরো বেশি উপলব্ধি করা। আমার ফ্রেন্ডের বিয়ে হল এই তো পাচ মাস হল। ওর ধারণা ছিল জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পর্ক হল হাজব্যান্ড-ওয়াইফ। বাকি সব সম্পর্ক কারো সাথে না থাকলেও চলে। ও ভেবেছিল বন্ধুত্বের সম্পর্কও হাজব্যন্ড দিয়ে ফিল আপ করা যাবে। কিন্তু কি আর করা, ভাইয়াও ডাক্তার। সময় দিতে পারেনা একটুও। তাই আমার ফ্রেন্ড একটু দুঃখ করে বলছিল আসলে জীবনে সব সম্পর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই যে হোস্টেলে আছি, ফ্রেন্ডের সাথে পড়ছি, অনেক কিছু শেয়ার করছি এটা তো আর সবার সাথে শেয়ার করা যায়না। বন্ধুদের সাথে যেটা শেয়ার করা যায় তা কি আর হাজব্যান্ডের সাথে শেয়ার করা যায়? কিংবা হাজব্যান্ডের সাথে যা শেয়ার করা যায় তাতো আর বন্ধুদের সাথে করা যায়না।

আবার বন্ধুত্বের সম্পর্কের মাঝেও অনেক ধরনের সম্পর্ক থাকে। সেই সম্পর্কও মেইনটেইন করা শেখা যায় হোস্টেলে থেকেই। আমার হয়ত তিনজন ফ্রেন্ড খুব ক্লোজ, কিন্তু তারপরও আমার কোন ক্রিটিক্যাল মোমেন্টে হয়ত আমি কেবল একজনকেই সব শেয়ার করব। কিংবা আমি যাকে খুব ফ্রেন্ড ভাবছি সে আমাকে আদৌ তা হয়ত ভাবছেনা। যাকে ফ্রেন্ড মনে করে অনেক কিছু শেয়ার করলাম সে হয়ত সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলনা। এরকম বন্ধুত্বের মাঝে বহু সম্পর্ক থাকে যা আসলে ডিফাইন করা যায়না। কিন্তু তারপরও আমরা সবাই ফ্রেন্ড।

হোস্টেলে থাকার ফলে আমি যে জিনিসটা খুব প্র্যাক্টিক্যালি শেখার চেষ্টা করেছি তা হল এটিচিউড পরিবর্তন করা। প্রতিটা মানুষই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। একেকজন একেকরকম। আমার চিন্তা-ভাবনার সাথে হয়ত সবাই মিলে যাবেনা। হয়ত আমি যেরকম করে একজনকে নিয়ে ভাবি, সে আমাকে নিয়ে ভাববেনা। আবার আমাকে নিয়েও কেউ হয়ত একরকম চিন্তা করবে, আমি মোটেই সেরকম না। এরপর বন্ধুত্বের সম্পর্কের মাঝে কিছুটা ফাটল। একটা কথা আছে, নিজে ভাল তো জগত ভাল। এই ব্যাপারটা আসলেই তাই। নিজে যদি সবসময় যেকোন সিচুয়েশানে এটিচিউড পজিটিভ রাখতে পারি তাহলে সব সমস্যা নিমেষেই শেষ।

থিওরিটিক্যাল এরকম বহু কথা এর আগে আমি শুনেছি। কিন্তু যে আমাকে ভুল বুঝল, মনে করল আমি তার আসল বন্ধু না, এজন্য হয়ত এমন কিছু কাজ করল যা কখনই পজিটিভ এটিচিউড দেখানোর মত মানসিক পরিস্থিতি থাকেনা। কিন্তু এই সি্চুয়েশানেও যদি পজিটিভ এটিচিউড দেখানো যায় তাহলে অন্যরকম একটা আউটপুট পাওয়া যায়। একেবারে প্র্যাকটিক্যাল, কোন হাইপোথিসিস না।

কিন্তু এর জন্য যেটা দরকার সেটা হল নিজের প্রতি পর্যবেক্ষন। আমি কখনই ১০০% সঠিক না। অন্য কেউও ১০০% সঠিক না। কিন্তু সবার মাঝেই অবশ্যই ভাল কিছু থাকে যা সবকিছুর উপরে থেকে তার প্রতি পজিটিভ এটিচিউড দেখানো যায়। একজন যদি ভাল নাও হয় , জেনে রাখতে হবে সে একেবারে খারাপও না। তার সেই ভাল দিক চিন্তা করেই পজিটিভ এটিচিউড দেখাতে হয়।

জীবনের আসলে অনেক অর্থ আছে। জীবনে অনেক কিছু করার আছে। ছোট এই জীবনে শুধু শুধু মাইনর ব্যাপার নিয়ে সম্পর্কের মাঝে একটি অবিশ্বাস তৈরি করার কোন মানে নাই। কারো সাথে শত্রুতা মনোভাব নিয়ে থাকারও কোন মানে নাই। কেউ আমাকে বন্ধু ভাবুক আর নাই ভাবুক আমি অন্তত কাউকে শত্রু ভাববনা। এই পজিটিভ এটিচিউড যদি নিজের মধ্যে গ্রো করানো যায় তাহলে দেখা যায় সময় গুলো আর বন্ধুদের সাথে অন্য কারো সমালোচনা, গীবত করে কাটেনা। বন্ধুদের সাথে সময়গুলো আরো বেশি মধুর আর অর্থবোধক হয়ে উঠে। জীবনের আসল মিশন থেকে দূরে গিয়ে আর অন্যের ব্যাপারে শত্রুতা পোষণ করাকে তখন খুব বোকামি মনে হয়। মনে হয় আসলে সত্যিই বন্ধুত্ব একটি অন্যরকম উপহার।

বন্ধুত্বের প্রতি না কেবল, জীবনের সকল সম্পর্কের প্রতি যদি পজিটিভ এটিচিউড দেখাতে পারি তাহলে আমাদের চারপাশে অনেক কিছুই সুন্দর হয়ে উঠবে যা আগে কখনও এত সুন্দর হয়ে দেখা দেয়নি। মনে হবে এই একটি মাত্র জীবনে আসলে ইরিভারসিবল বলে কিছু নাই। সবকিছুই রিভারসিবল হতে পারে। যাকে কখনই ক্ষমা করবনা বলে মনে করা হয় সেই হতে পারে জীবনের পরম বন্ধু। যে ভুল কখনই শোধরানো যাবেনা বলে মনে হয় সেই ভুল থেকেই কেউ হয়ত আরো বেশি শুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

হোস্টেলে থেকে আসলে বিভিন্ন বন্ধুর সাথে পজিটিভ এটিচিউড দেখানোর একটি প্র্যাক্টিক্যাল প্ল্যাটফর্ম পাওয়া যায়। আর সেটা যদি জীবনের সকল সম্পর্কেও এপ্লাই করা যায় তাহলে তো আর কথাই নেই। !!!

আক্ষেপ ! :-(

কয়েকদিন ধরে মনের ভিতর কিছু আক্ষেপ জমা হয়েছে। কেমন আছি কেউ জিজ্ঞেস করলে হয়ত বলব ভাল আছি, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আসলেই কি আমি ভাল আছি? তুলনামূলক ভাবে হয়ত ভাল আছি তাদের তুলনায় যারা আমার থেকেও খারাপ অবস্থায় আছে। প্রতিনিয়ত যত বেশি কাজের চাপ বাড়ছে, পড়াশুনার ব্যস্ততা বাড়ছে তত নিজেকে অসুখী মনে হচ্ছে।

সেদিন পড়তে গিয়েই হঠাৎ মনে হল এমন কোন সিস্টেম যদি থাকত যে যা পড়তে চাই তা সব ব্রেইনের মধ্যে আপলোড হয়ে যাবে। তাহলে কষ্ট করে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষ্ট করে বই এর সামনে বসে থাকা লাগবেনা।প্রতিদিন ক্যাম্পাসে যেতে কার ভাল লাগে? খুব টায়ার্ড ফিল করছিলাম সেদিন, কিন্তু কি আর করা! যেতেই হবে। মনে হচ্ছিল এমন কোন ব্যবস্থা যদি থাকত যে মনে চাইল আর সাথে সাথে সেখানে চলে গেলাম। এরপর পরীক্ষার আগ মুহূর্তে যখন খাওয়ার সময়ও থাকেনা তখন মনে হয় যে ইশ! খেতে চাই মনে হলেই যদি খাবার সব সামনে হাজির হয়ে যেত! এরপর অটোমেটিক্যালি সব খাওয়া হয়ে যেত...এসব হাবিজাবি আক্ষেপে আজকাল মন ভারাক্রান্ত থাকে।
বিকেলে লাইব্রেরি থেকে বাসায় ফেরার পথে যখন মাথার উপর নির্মল আকাশ দেখি, একঝাঁক পাখিদের আনন্দে উড়াউড়ি দেখি তখন নিজের মনের আক্ষেপ আরো বেশি বেড়ে যায়। একদম যদি ফ্রি হয়ে যেতে পারতাম যাবতীয় সব টেনশান থেকে, ওই দূর আকাশের পাখিদের মত যদি আনন্দে ডানা মেলে উড়তে পারতাম!

খুব শখ, গভীর রাতে ছাদের উপর দাঁড়িয়ে নভোবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আকাশের তারা দেখার। সারারাত আকাশের ওই তারাগুলোর সাথে নিরিবিলি সময় কাটাবার। নিজের সাথে নিজেকে বোঝাপড়ার জন্য এর থেকে ভাল মুহূর্ত আর কি হতে পারে! কিংবা ঝুম বৃষ্টিতে টানা ভিজে যাওয়া আর প্রকৃতির সাথে চুপি চুপি খেলা করা। কিন্তু কি এক জীবন...যেখানে এসব শখ বিলাসিতা ব্যতিত কিছুইনা।
মন খারাপ থাকলে কেন জানিনা যা কিছুই করতে যায় সেসব কাজে গভীর মনোযোগ দিতে পারি। সময়ের তাড়াহুড়া থাকেনা তখন। ঠিক এরকম একটি মুহূর্তে যখন কুরআন পড়ছিলাম তখন মনের ভিতরের আক্ষেপ আরো বেশি জোরাল হয়ে উঠল। আরবী ভাষা যদি বাংলার মত ফ্লুয়েন্টলি বুঝতে পারতাম! বারবার আরবি পড়ে বাংলা অনুবাদ পড়তে ভাল লাগেনা। ছোটবেলা থেকেই এটলিস্ট একজন মুসলিম হিসেবে আরবি ভাষা সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ হিসেবে শেখা কি উচিত ছিলনা? ইংরেজি নিয়ে কত মাতামাতি আমাদের। কেন সাথে আরবি ভাষা থাকলে কি খুব অসুবিধা হয়ে যেত ক্যারিয়ারের পথে? হঠাৎ এই আক্ষেপ মনে হতেই সিদ্ধান্ত নিলাম আমার পরবর্তি জেনারেশানের জন্য ইংলিশের পাশাপাশি আরবি ভাষা কম্পালসারি হিসাবে রাখব। ঠিক এই সিদ্ধান্তে আসার পর একটু ভাল অনুভূত হচ্ছে...মনের আক্ষেপ ধীরে ধীরে নিউট্রাল হচ্ছে।

কোথায় যেন পড়েছিলাম প্রভু থাকেন দূর্বল মানুষের অন্তরে। ঠিক জানিনা কথাটা কোন এঙ্গেল থেকে বলা হয়েছে, তবে কথাটার মধ্যে কিছু নাস্তিক্যবাদী ঘ্রাণ আছে। আগে একটা সময় নাস্তিক-আস্তিক আমার কাছে খুব স্পর্শকাতর একটা ইস্যু ছিল। কিন্তু সময়ের গতিবেগের সাথে যেসব খুব স্পর্শকাতর ব্যাপার ছিল আমার কাছে তা ধীরে ধীরে খুব সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়। আসলে বিশ্বাস ব্যাপারটা একদম অন্তরের অন্তস্থলের ব্যাপার। এই ব্যাপারটা নিয়ে যে চিন্তা করেনা তার সাথে নাস্তিক-আস্তিক নিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা আলোচনা চালিয়ে যাওয়া নিছক বোকামী ছাড়া কিছু মনে হয়না।

মানুষ দূর্বল কিনা জানিনা তবে চারপাশে যখন অন্যায়-অবিচার দেখি, যখন একজন নিরপরাধ মানুষকে শুধু শুধু শাস্তি পেতে দেখি, যখন কঠিন অপরাধীদেরও দিব্যি নিরপরাধ হিসেবে ক্রুর হাসি হাসতে দেখি তখন পৃথিবীর সকল মানুষকে আমার বড় দুর্বল মনে হয়। শুধু এটুকু মনে হয়, প্রভু যদি সত্যি না থাকত তবে পার্থিব আক্ষেপের কোন সীমা পরিসীমা থাকতনা। জীবনকে তখন মনে হত এক অভিশাপের প্রতিচ্ছবি। আক্ষেপ ধীরে ধীরে ডাইলিউট হতে থাকে যখন চিন্তা করি সেই বিচার দিবসে এমন একজন বিচারপতি হবেন যার দ্বারা ইনজাষ্টিস হবার কোন চান্স নাই। যিনি হবেন সকল বিচারকের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠতম বিচারক। যিনি প্রত্যেকের চুল পরিমান ন্যয় ও অন্যায়কেও বিচারের আওতাধীন রাখবেন। ইশ! যত কুরআন পড়ি ততই বুঝতে পারি, মানুষ আসলেই কত দুর্বল। যে কিনা নিজের সবচেয়ে কাছের একজনকে সন্ধান করতে পারেনা। যে কিনা তার সর্বমুহূর্তের সঙ্গি কে আবিষ্কার করতে পারেনা। সত্যিই মানুষ আসলেই দূর্বল যদি সে তার প্রভুকে চিনতে না পারে।

জীবন নিয়ে আসলে আমরা যে যেরকম ভাবিনা কেন আসলে তা পুরাই আক্ষেপে ভরপুর। এবং আক্ষেপ যদি সারা জীবনও করে যাই তাও পূর্ণ হবার নয়। মানব হৃদয়কে পৃথিবীতে আসলে এরকম করেই পাঠানো হয়েছে। আমার যত আক্ষেপ তা সবই স্বর্গীয় আক্ষেপ। মন যা চাইবে তাই সাথে সাথে হয়ে যাবে। এটা তো সেই চির আকাংখিত জান্নাত ব্যতিত কোথাও পূর্ণ হবার না। স্বর্গীয় আক্ষেপ আছে বলেই হয়ত জীবন টা মাঝে মাঝে বোরিং হলেও কোন কিছুর পাবার আকাঙ্ক্ষা সব কষ্টকে , সব দুঃখকে সহ্য করা যায়। এভাবেই জীবন কেটে যাবে স্বর্গীয় আক্ষেপের মধ্য দিয়ে। তাই হয়ত কোরআনে যে বার বার সেই মোহময় জান্নাতের বর্ণনা দেয়া হয় সৎকর্মশিল মুমিনদের জন্য যা কোন মানব হৃদয় কল্পনা করতে পারবেনা তা সত্যিই অসাধারণ। একদম মানব মনের ভিতরের আক্ষেপের পূর্ণতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি জীবনকে খুব জীবন্ত করে তোলে। নতুন করে আবার রিভাইভ করতে ইচ্ছা করে। আক্ষেপের তীব্রতা যতই বাড়ছে ততই জীবন আরো জীবন্ত হয়ে উঠছে.........

মনোরসায়নঃ এলোমেলো আলাপ-৬

কয়েক মাস আগে “Road To Mecca”র বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কখনও কোন ইংলিশ বই এর বাংলা অনুবাদ পড়বনা। অনুবাদ আসলে খুব কঠিন ছিল কিনা জানিনা, তবে আমার পড়তে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। যাইহোক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পল কেলহো’র দুইটি ইংলিশ নভেল পড়লাম। একটি বই ছিল একটি মেয়ের জীবনী নিয়ে যা সে তার নিজের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছিল। পড়ে মারাত্বক অভিভূত হলাম।
এই ডায়েরি জিনিসটা কেন যেন আমার কখনও মেইনটেইন করা হয়না। ছোটবেলা থেকেই অনেক বার এটেম্পট নিয়েছিলাম ডায়েরি নিয়মিত লেখার। অবশ্য এই এটেম্পট নেবার পিছনে অন্য আরেকটি কারণও ছিল, তা হল প্রচুর ডায়েরি গিফট পেতাম।কিন্তু আসলে শেষ পর্যন্ত কোন ডায়েরি আমি লিখতে পারিনি।

যাইহোক, ডায়েরি নিয়মিত লিখলে একটি জিনিস খুব ভালভাবে এনালাইসিস করা যায় তাহল- নিজের ম্যাচিউরিটির ক্রমাগত পরিবর্তন। মেডিকেলের এক ভাইয়া বলছিলেন যে তিনি ক্লাস ফাইভ থেকে ডায়েরি লিখেন, এবং তিনি দেখেছেন যে তার ব্যসিক চিন্তা-ভাবনার কোন পরিবর্তন এখনও হয়নি। আমার তো মনে হয় গতকাল আমি যে চিন্তা করেছিলাম তা আজকেই কিছুটা হলেও মডিফাই হয়ে যাবে।
হুম, ব্যসিক চিন্তা হয়ত সেভাবে মডিফাই হবেনা, কিন্তু আশেপাশের চিন্তা অবশ্যই

ছোটবেলা থেকেই খুব কৌতুহল ছিল সবকিছুর প্রতি। যা সাধারণত সবার ভিতরই থাকে। এই যেমন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, পাশে কোন দোকান। সেই দোকানে কি আছে, লোকজন কিভাবে কেনাকাটা করছে, কিভাবে কথা বলছে সব কিছুর প্রতি চরম আকর্ষণ। ক্লাস সেভেন অথবা এইটে থাকতে বিজ্ঞানীদের সংগা পড়েছিলাম যে বিজ্ঞানী হবার মেইন শর্ত হল কৌতুহল থাকা। অর্থাৎ জানার আগ্রহ যার মধ্যে নাই সে কখনও বিজ্ঞানী হতে পারবেনা। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম আমার বিজ্ঞানী হবার স্টেপ শেষ। কারণ কৌতুহল কমে যাচ্ছিল সবকিছুর প্রতি। কেন হবেনা! পড়াশুনার প্রতি কৌতুহল আমার কোন কালেও ছিলনা। জানার আগ্রহ আছে তবে সেটা অবশ্যই পড়াশুনার বাইরের জগতের প্রতি।

সেদিন ভাবছিলাম যে বাংলাদেশের মানুষের অনেক সম্ভাবনা ছিল যুগে যুগে ভুরি ভুরি বিজ্ঞানী প্রজনন করার। ফার্মগেটের রাস্তার পাশে দাড়ালে দেখা যায় কেউ মাইকে ওয়াজ করে ভিক্ষা করছে, কিছু মানুষ তার পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাসুন্দি দিয়ে আনারস বিক্রি করছে তার পাশেও কিছু মানুষের ভিড়। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে রাস্তা খননের কাজ চলছে কিংবা ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে তার পাশেও ভিড়। এত্ত কৌতুহল সবার!! আবার কেউ রাস্তায় এক্সিডেন্ট করেছে তার পাশেও ভিড় লেগে থাকে। কোথায় ইনজুরড লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে তা না করে সব তাকিয়ে তাকিয়ে ভিড় করে দেখে। কি যে দেখে আল্লাহই জানে!
বলছিলাম চিন্তাভাবনার পরিবর্তন...হুম। সেদিন এক ব্যসিক চিন্তা পুরাপুরি পরিবর্তিত হয়ে গেল। এবং কথায় কথায় ফ্রেন্ডকে সেদিন একথা বলছিলাম, দেখলাম সেও কিছুটা কনফিউসড।
আমরা যারা অন্যদের বদলে দেবার প্রত্যয় নিয়ে সর্বদা চিন্তা করি ভেবেও দেখিনা সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিজেদের মধ্যে আনতে হবে। আমাদের সমগ্র কাজের ইনসেনসিবল পার্ট হল নিজেকে নিজের জায়গায় ঠিক রেখে অন্যকে বদলে দেয়া। হুম, আমি বলছিনা যে সবসময় আমাকে বদলাতে হবে। তবে যে জিনিসটা আমি অন্যের মধ্যে দেখতে চাই সেটাই কেন নিজের মধ্যে প্রথমেই আয়ত্বে আনার চেষ্টা করিনা?
ইথিক্যাল কথা যদি নিজের মধ্যেই ধারণ করা না গেল তাহলে ইথিকসের কথা না বলাই ভাল। তা না হলে সেটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হয়ে যায়। বেশির ভাগ সময় দেখা যায় কোন একটা অন্যায় কাজ করছি, ক্রমাগত ভুল হচ্ছে। তারপর নিজেদের সেই অন্যায় থেকে নিউট্রাল করার জন্য বলছি “ আমি তো আমার অন্যায় বুঝতে পারছি, কিন্তু অন্যরা তো সেটাও পাচ্ছেনা”। এমন না যে অন্যায় কিংবা ভুল থেকে শুধরানোর চেষ্টা বরং অন্যায় কে নিজেদের ভিতর ধীরে ধীরে ডাইলিউট করা।

এখন আসি যে অন্যায় বুঝতে পারছে সে বেশি ক্ষতগ্রস্থ নাকি যে বুঝতে পারছেনা সে বেশি??

আমার ক্ষেত্রে যেটা হয় যে বেশিরভাগ সময় আমি বুঝতে পারি যে কেন আমার অমুক ভুল বা অন্যায় হল? আমার ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলেছি তার ক্ষেতেও সেইম। কিন্তু সবশেষ একটাই সান্ত্বনা যে আমরা তো অন্যায় বুঝতে পেরেছি, অন্যরা কি তা পারছে? সুতরাং......
ব্রেইনের সম্মুখ বা ফ্রন্টাল লোবের সাথে অন্যান্য সব অংশের সংযোগ থাকে। ফ্রন্টাল লোব বেসিক্যালি মানুষের বিবেক বুদ্ধি, বিবেচনা, ভাল-মন্দ সেন্স, আবেগ-অনুভূতি, পারসোনালিটি, সামাজিক আচরন ইত্যাদি এসবের জন্য সিগন্যাল দেয়। তাই ভাল-মন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা জন্ম থেকেই আমরা পেয়ে থাকি। যদি চুরি কিংবা মিথ্যা কথা বলি তাহলে ফ্রন্টাল লোব সাথে সাথে একটা নেগেটিভ সিগন্যাল দিবে। যদি সেই নেগেটিভ সিগন্যাল কে আমরা ওভারলুক করি তাহলে ফ্রন্টাল লোবের সাথে অন্যান্য অংশের কাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নাহ! এটা কিছুদিন বা কয়েকমাসের জন্য না। ক্রমাগত দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রন্টাল লোবের নেগেটিভ সিগন্যাল যখন এভয়েড করা হয় তখন সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটে যায় একদম অজান্তেই। যে মানুষটা যত বেশি জানে তার ফ্রন্টাল লোবের নেগেটিভ সিগন্যাল যদি বেশি বেশি এভয়েড করা হয় তাহলে ব্রেইনের অন্যান্য অংশের সাথে ভারসাম্য তার বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে আমরা যাকে সচরাচর ভাল মানুষ হিসেবে জানি দেখা যায় সেই এমন একটা অপ্রত্যাশিত কাজ করে যা কোন সমীকরণেই মেলানো যায়না।
আমরা হয়ত বলে থাকি এরকম একজন ভাল মানুষ সে কিভাবে এই কাজটা করতে পারল যা কিনা একজন সাধারণ মানুষ থেকেও আশা করিনা?? লুক্কায়িত মেসেজ আসলে ফ্রন্টাল লোবের এই থিওরির মধ্যেই লুক্কায়িত।




খুব সুন্দর কিন্তু মারাত্বক বৈজ্ঞানিকভাবে কুরআনে সূরা আ’লাক্বে ১৫-১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে,

“সে কি জানে না , আল্লাহ দেখছেন ? কখনই নয় , যদি সে বিরত না হয় তাহলে আমি তার কপালের দিকে চুল ধরে তাকে টানবো , সেই কপালের চুল ( ওয়ালা ) যে মিথ্যুক ও কঠিন অপরাধকারী।”

তাই কোন কিছু না জেনে না মানার মধ্যে ক্ষতি যতটা তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হল জেনে পালন না করা। তাই অন্তত আজকে একথা জানার পর থেকে ওই কথা বলার সুযোগ আর থাকলনা “আমি তো আমার অন্যায় বুঝতে পারছি, কিন্তু অন্যরা তো সেটাও পাচ্ছেনা”।

লেখার শেষ মুহূর্তে এসে মনে হল আমার লেখার মোরাল লেসন অনেকেই ভেবে বসতে পারেন, যে “যত কম জানা যায় ততই উত্তম”। কিন্তু আমি আসলে যতটুকু জানি ততটা মেনে চলার চেষ্টার তাগিদে এই এলোমেলো লেখাটা শেয়ার করলাম।