শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৩

হাটি হাটি পা পা......




পাঁচ বছরের ছেলে আবির। বাবা-মায়ের খুব আদরের সন্তান। খুব কিউট চেহারা। একটি অনুষ্ঠানে সব মায়েরা যেখানে গল্প করে সেখানে আবিরের মা খুব গর্বের সাথে অন্য এক ভাবিকে বলছে তার ছেলে সিনেমার নায়কের মত বিকেলে খেলতে গিয়ে কোন মেয়েকে ফুল দিয়েছে। এটা শুনে সবাই হাসছে আর আবিরকে আদর করে অনেকেই বলছে একদম নায়কের মত হবে দেখতে। সব মেয়েরা পিছনে ঘুরে বেড়াবে।
ঘটনাটা খুব সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্তু এই পাঁচ বছরের বাচ্চার নিজস্ব জগতে ঘটনাটা মোটেই সাধারণ না। পরিবার, পরিবেশ কিভাবে একজন বাচ্চাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে সেটার উপর ব্যাসিস করেই এই সিরিজ লেখা চলবে। আমাদের বাবা-মায়ের ভূমিকা কতটুকু এবং বাচ্চাকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনটা নেগেটিভ ও পজিটিভ সেটাই এই সিরিজে ফুটে উঠবে ইনশয়াল্লাহ।
শিশুদের জগত আর আমাদের বড়দের জগত একেবারেই আলাদা। আমরা বড়রা যখন একটি শিশুকে ধীরে ধীরে বড় হতে দেখি তখন যদি এই শিশুর জগতের সাথে একেবারে মিশে না যাওয়া যায় তাহলে শিশুদের নিজস্ব জগতের হাসি,কান্না, আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জগতে বিরাট আলোড়ন ঘটে যায়। একটা নেগেটিভ ইম্প্যক্ট নিয়ে শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
আচ্ছা বাচ্চাদের জগতের সাথে আমাদের জগতের পার্থক্য কোথায়?
বাচ্চাদের ব্রেইনের গঠন শুরু হয় মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় যখন তার বয়স মাত্র তিন সপ্তাহ। বাচ্চা পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই তার কিছু প্রাইমারি ব্রেইন গঠন পূর্ণ হয়ে যায়। যেমনঃ কান্না করা, হাত-পা নাড়াচাড়া, ফিডিং রিফ্লেক্স, আই কন্ট্যাক্ট ইত্যাদি। বাচ্চাদের ব্রেইনের সাথে বড়দের ব্রেইনের পার্থক্য হল বাচ্চাদের ব্রেইন অনেক বেশি ইম্প্রেসনেবল। অর্থাৎ তাদের যত ইনপুট দেয়া তারা সেটাকেই ক্যাপচার করবে। কিন্তু আমাদের কোন ইনপুট দেয়া হলে আমরা সাথে সাথেই সেটা ক্যাপচার করবনা। আচ্ছা আপনার খুব অভ্যাসগত বিষয়কে কেউ যদি এখন বদলে দিতে চায় সেটা কি আপনি মেনে নিবেন? নিবেননা। কিন্তু বাচ্চাদের এই ইম্প্রেসনেবল ব্রেইন যেকোন ইম্প্রেসন সাথে সাথেই তাদের ব্রেইনের নিউরনে সিন্যাপ্স তৈরি করে ফেলবে। ফলে যত ধরনের ইনপুট আপনি দেননা কেন এতে বাচ্চা মোটেই বিরক্ত হবেনা।
ব্রেইনের পরিপূর্ণ গঠন নির্ভর করে জেনেটিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর । একটু সহজভাবে বুঝিয়ে বলি। একটি টেলিফোন লাইনের কথা চিন্তা করেন। যেখানে সব ডিজিট নির্দিষ্ট ও নেটওয়ার্ক কতটুকু পর্যন্ত কাজ করবে সেটাও নির্দিষ্ট। কিন্তু আপনি এই টেলিফোন লাইন দিয়ে কিভাবে আপনার নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করবেন, কাদের সাথে কথা বলবেন, কি কাজে কথা বলবেন সবই অনির্দিষ্ট। জেনেটিক ব্যাপারটা ঠিক টেলিফোন লাইনের ডিজিট ও নেটওয়ার্কের মত, এখানে কারো কোন হাত নেই। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিবেশ হল এই টেলিফোন আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন সেটা নির্ধারণ করে।
জন্মের পরপরই ব্রেইনে নিউরনের সংখ্যা থাকে প্রায় ১০০বিলিয়ন। বাচ্চা যখন ধীরে ধীরে বড় হয় তখন এই নিউরনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়না বরং এক নিউরনের সাথে আরেক নিউরনের সংযোগ বৃদ্ধি পায় যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় সিনাপ্স। এই সিনাপস্পই মূলতঃ শিশুর ব্রেইনকে ধীরে ধীরে পরিবেশের সাথে ম্যাচিউর করে তুলে। সিনাপ্সের কার্যকারিতা নির্ভর করে মায়েলিনেশানের উপর। মায়েলিনেশান হল পরিবেশের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেবার যোগ্যতা। অর্থাৎ একটি বাচ্চাকে যখন আপনি কোন কমান্ড করবেন তখন সেটা প্রথমে সে শুনবে এরপর এই কমান্ড তার ব্রেইনে গিয়ে আপনার কমান্ডকে প্রোসেসিং করে কি করতে হবে সেটা নির্দিষ্ট করবে, এরপর বাচ্চাটি আপনার কমান্ড অনুসরন করবে। এই যে এত ধীর গতিতে বাচ্চাটি কাজটি করবে এটার কারণ হল দূর্বল মায়েলিনেশান। অর্থাৎ এক নিউরনের সাথে আরেক নিউরনের সংযোগ বৃদ্ধি পাবেনা যদিনা মায়েলিনেশান ঠিকমত না হয়।
শিশুদের ব্রেইনের সিনাপ্স তিন বছর বয়সে প্রায় ৮০%, পাঁচ বছর বয়সে ৯০% পূর্ণ হয়ে থাকে। বয়ঃসন্ধিতে সিনাপ্স প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এজন্য একজন বাচ্চাকে ছোটবেলা থেকে যে ভাষায় শিক্ষা দিবেন ঠিক সে ভাষাই সে সুন্দরভাবে রপ্ত করে ফেলবে। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পর যে ভাষা সে শিখবে সেটার কিছু দুর্বলতা থাকবে। যেমন বাংলা ভাষার একজন শিশু যখন বয়ঃসন্ধির পর ইংরেজি ভাষা শিখবে হয়ত সে ব্যাকরণ, শব্দভান্ডার, কথা বলা সবই শিখতে পারবে কিন্তু উচ্চারনগত একটা বাঙ্গালিয়ানা ভাব থেকেই যাবে। ইংরেজদের মত করে উচ্চারন হবেনা কিছুতেই। আসলে বয়ঃসন্ধির পর ব্রেইনের ইম্প্রেসনেবল ক্যপাবিলিটি ধীরে ধীরে কমে যায়। সিনাপ্স পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই নতুন কিছু শেখা মানেই পুরান কিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুছে যাওয়া।
যাইহোক ব্রেইনের কার্যক্ষমতা আসলে ইলেক্ট্রিক্যাল সারকিটের মত। যত বেশি পরিবেশের সাথে ব্রেইন পরিচিত হবে তত বেশি নিউরনাল সার্কিট তৈরি হবে। বাচ্চাদের এই সার্কিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জন্মের পরপরই বাচ্চার সাথে মা কথা বলছে, গান গেয়ে শুনাচ্ছে, বিভিন্ন গল্প করছে এতে করে বাচ্চা কথা কিছু না বুঝলেও তার নিউরনাল সার্কিট তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই সে কোন ব্যাকরন, শব্দভান্ডার ছাড়াই কেবলমাত্র শুনে শুনে সে কথা বলা শিখে যাবে।
বয়সভেদে শিশুদের ব্রেইনের ম্যাচিউরিটি বিভিন্ন হয়ে থাকে। একেক বয়সে শিশু একেকরকম ভুবন গড়ে তোলে তার নিজের মধ্যে। এই ভুবন গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি যারা ভূমিকা রাখেন তারা হলেন পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোন প্রমুখ। এই ভুবন গড়ে তোলার মুহুর্তে যদি বাচ্চাকে আমাদের অজান্তেই নেগেটিভলি আমরা স্টিমুলেশান দেই তাহলে সেটার পরবর্তি ফলাফল হবে খুব অপ্রত্যাশিত।
ছয় মাসের বাচ্চা কিংবা দুই বছরের বাচ্চার সাথে যদি সঠিক প্যারেন্টিং গাইডলাইন না থাকে তাহলে বাচ্চার মানসিক, শারীরিক উভয়ই মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই শিশু লালন-পালন বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন ও আগ্রহী হওয়া খুব জরুরি।

বুধবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৩

কষ্টের সাথেই স্বস্তি (২)

অবশেষে প্রফ শেষ হল ফাইয়াজের বাবা ঢাকার বাইরে ক্লিনিকে গেল জব করতে আর আমি চলে আসলাম বাবা মায়ের কাছে ততদিনে আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত প্রফের ধকল মনে হচ্ছিল তখনও যায়নি তবুও প্রশান্তি এটুকু ছিল যে ফাইনাল প্রফ অবশেষে শেষ হল বাবার বাসায় আসার পর সর্বপ্রথম আমার খুব অপরাধবোধ হচ্ছিল এটা ভেবে যে ফাইয়াজ পেটে আসার পর অতিরিক্ত টেনশানে প্রথম ভেবেছিলাম এমআর করব কিনা ( আল্লাহ মাফ করুক) বাবার ওখানে পাশের এক আপু এসেছিল, যে গত কয়েক বছর ধরে কনসিভ করছে কিন্তু এবরশন হয়ে যাচ্ছে এজন্য সেই দম্পতি খুব মনোকষ্টে ছিল আমার কাছে এসেছিল ভাল একজন গাইনি ডাক্তারের খোজ নিতে তাদের ঘটনা শুনে আমার অপরাধবোধ আরো বেড়ে গিয়েছিল ভাবছিলাম আল্লাহ আমাকে এত বড় একটা উপহার না চাইতেই দিয়ে দিল, আর আমি কিনা সেজন্য শুকরিয়া পর্যন্ত আদায় করলাম না!

প্রফের রেসাল্ট দেয়ার পূর্বে আমার টেনশান এত বেশি হচ্ছিল যে ঠিকমত কারো সাথে কথাও বলতে ইচ্ছা করতনা মেজাজ সবসময় খিটখিটে হয়ে থাকত তার উপর একা একা সংসার সামলানো আমার জন্য পুরাই অসম্ভভ হয়ে পড়ছিল রান্না ঘরে গেলেই বমি হত কিছু খেতে গেলেও বমি এমতাঅবস্থায় যদি রেসাল্ট খারাপ হয় তাহলে এই শরীরে আবার কিভাবে সাপ্লি দিব !! সাতপাচ অনেক কিছু ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম বাবা-মায়ের সাথে একসাথে বাসা নিয়ে থাকব আমার শাশুড়ি,ননদ কেউই ঢাকায় থাকেনা তাই প্রফের রেসাল্টের কিছুদিন আগেই বাসা শিফট করে আমার হাসপাতালের কাছে বাবা-মায়ের সাথে নতুন বাসায় উঠলাম এরপর এক বিকেলে প্রফের রেসাল্ট বের হল এবং আমার রিডিং পার্টনার প্রথমেই ফোন করে আমাকে কংগ্রাচুলেশান জানাল যে আমি ডাক্তার হয়ে গিয়েছি সেই মুহূর্তটা যে কি পরিমান আনন্দের ছিল ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা সত্যি কথা বলতে কি আমার তখন মনে হচ্ছিল ফাইয়াজের সুবাদেই আল্লাহ আমাকে সাপ্লি দেবার মত অনেক বড় বোঝা থেকে মুক্তি দিয়েছে তারউপর বাবা-মায়ের সাথে বিয়ের পরেও একসাথে থাকার যে উসিলা সেটাও ফাইয়াজের কথা ভেবেই আসলে আল্লাহ মানুষের জন্য যা প্ল্যান করেন সেটাই উত্তম যদি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা যায়

আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে ফাইয়াজকে পেটে নিয়ে যখন মেডিসিন ভাইভা দিতে যাই তখন কেবলই মনে হচ্ছিল প্রফের মত পার্থিব আজাব মনে হয় আর কোন কিছু হয়না আমার লং কেইস ছিল একজন এসাইটিস(পেটে পানি জমা) এর পেশেন্ট তার উপর হিস্ট্রি,পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে আমার বমি চলে এসেছিল কোনরকম এন্টিএমেটিক খেয়ে পরীক্ষাটা শেষ করেছিলাম সার্জারী পরীক্ষায় পুরা হল জুড়ে ছিল এক ভয়ার্ত নিরবতা কারণ সার্জারী ডিপার্টমেন্টাল হেডের চিল্লাচিল্লিতে সবার ত্রাহি অবস্থা লং কেইস, শর্ট কেইস শেষে যখন স্যারের কাছে ভাইভা দিতে যাব তখন কেবলই মনে হচ্ছিল পাশ-ফেইল যাইহোক এই ভয়ার্ত নিরবতা থেকে আমি মুক্তি পেতে চাই ভাইভাতে স্যারের বকাবকি ছাড়াই আমি উতরিয়ে গেলাম,আলহামদুলিল্লাহ আর গাইনি বরাবরি আল্লাহর রহমতে ভাল পরীক্ষা হল সবমিলিয়ে আমার তখন কেবল একটাই অনুভূতি, বিরাট সমুদ্র ছোট তরী নিয়ে সুন্দর ভাবে পাড়ি দেবার রহমত ফাইয়াজের জন্যই তাই যারা কেবল ক্যারিয়ারের জন্য বিয়া,সংসার,বাচ্চা-কাচ্চা নিতে ভয় পায়, আমার ধারণা তারা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে রহমতের অংশটুকু মিস করে যায়

এরপর শুরু হল ইন্টার্নি পেশাগত ডাক্তার হবার প্রথম ট্রেইনিং অনেকেই তখন আমাকে ইন্টার্নি করতে নিষেধ করল বাসায় রেস্টে থাকতে বলল কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি হাসপাতালে  যাওয়া, রোগী দেখা, ডাক্তার হিসেবে নিজের হাসপাতালে বিচরণ করার লোভ সামলাতে পারছিলাম না আর ততদিনে আমার সেকেন্ড ট্রাইমেস্টার চলছিল পুরাপুরি সুস্থ ছিলাম, শারীরিক-মানসিক সব সমস্যা থেকে মুক্ত আল্লাহর উপর ভরসা করেই ইন্টার্নি শুরু করলাম চেয়েছিলাম গাইনি দিয়ে শুরু করতে কিন্তু একাডেমিক্যালি আমার রোস্টার পড়ল সার্জারীতে প্রথমে এজন্য কিছুটা মন খারাপ ছিল মন খারাপটা আরো তীব্র হয়েছিল যখন আমাকে ডিপার্টমেন্টার হেডের ইউনিটে ইন্টার্নি করতে হবে এটা ভেবে কিন্তু ইউনিট চেইঞ্জ করার কোন সুযোগ ছিলনা পুরা চারমাসে সার্জারীতে ডিউটি করতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপে আমি বুঝেছিলাম সার্জারী ইউনিট-১ ছিল আমার জন্য আরেকটি বিশাল বড় রহমত সবকিছুতে অতিরিক্ত কিছু সুবিধা ভোগ করছিলাম আমার ফ্রেন্ড কাম কলিগরাও আমাকে অনেক ফেবার করত যেকোন কাজে নাইট ডিউট মেয়েদের ছিলনা ইভিনিং ডিউটিতে কখনও খুব খারাপ লাগলে আমার ফ্রেন্ড কে ডিউটি হ্যান্ডওভার করে চলে আসতে পারতাম সবমিলিয়ে সার্জারীতে কাজ শেখা, ডিউটি করা, সবার কাছে সহযোগীতা পাওয়া আমার ইন্টার্নি কে খুব অর্থবহ করে তুলেছিল তারউপর স্যার-ম্যাম দেরও আমার প্রতি আলাদা কেয়ারিং এটিচিউড আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সব আল্লাহর বিশেষ রহমত যা কেবল আমি ফাইয়াজের সুবাদে উপভোগ করছিলামআর আল্লাহর উপর ভরসা করে ইন্টার্নি শুরু করার সিদ্ধান্ত যে মোটেই ভুল ছিলনা এটাই  আরো বেশি করে বুঝলাম  


দীর্ঘ নয় মাস পর যখন ফাইয়াজ জন্ম নিল তার পরের দিন ফাইয়াজের বাবার বিসিএসের গেজেট প্রকাশিত হল একসাথে দুই আনন্দে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করার ভাষা খুজে পাচ্ছিলামনা বছর শেষে আমার ক্যারিয়ারে তখন দুইটা ডিগ্রি যুক্ত হল এক. এমবিবিএস ডিগ্রি, দুই. মাতৃত্বের অনুভূতি আসলে ক্যারিয়ার নিয়ে যেসব মেয়েরা অতিমাত্রায় সচেতন, এবং যেকারণে তারা সময়মত বিয়ে,সংসার,বাচ্চা নিতে ভয় পায় তাদের জন্য আমার একটাই পরামর্শ, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না আর আল্লাহর উপর ভরসা করলেই কেবল এই বিশেষ পরামর্শের উপযোগীতা উপলব্ধি করা যায় কোন কিছুই একাডেমিক ক্যারিয়ারের জন্য থেমে থাকবেনা বরং জীবনের সব পর্যায়কে ক্যারিয়ারের একটা পার্ট হিসেবে দেখলে দেখা যায় একসাথে সবকিছুই সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়ে যায় এই আমি যদি কেবল ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করতাম তাহলে কি বছর শেষে এত মূল্যবান দুইটা ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম ?? গভীরভাবে কি উপলব্ধি করতে পারতাম যে নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে?? নিশ্চয় সব প্রশংসা এবং ক্রেডিটের একমাত্র অধিকারী পরম করুণাময় আল্লাহ যিনি মানুষের প্রতিটা প্রার্থনায় সাড়া দেন

কষ্টের সাথেই স্বস্তি (১)

 তখন সবেমাত্র নতুন সংসার শুরু হল । এতদিন  বাবা মায়ের সংসারে যে আমার কখনও খুব একটা রান্না ঘরে ঢুকার প্রয়োজন হয়নি  সেই আমি তখন নতুন সংসার আর এম বি বি এসের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম । যাকে বলে একেবারে কুয়ার ব্যাঙ কে সমুদ্রের মধ্যে ছেড়ে দিলে যেরকম হয় আমার অবস্থা তার থেকে কম কিছু ছিলনা। চোখের পানি আর নাকের পানিতে আমার একেবারে কাহিল অবস্থা। এখনও সেসব কষ্টের দিনের কথা মনে পড়লে কান্না আসে। 

 প্রতিদিন ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর রান্না ঘরে চলে যেতাম। আলু ভর্তা,ডিম ভাজি কিংবা খিচুড়ি রান্না করে আমি চলে যেতাম আমার হাসপাতালে আর ফাইয়াজের বাবা তার হাসপাতালে। সারাদিন হলে থেকে টানা রাত দশটা পর্যন্ত আমি আর আমার রিডিং পার্টনার একসাথে প্রফের প্রস্তুতি নিতাম। এরপর ফাইয়াজের বাবা আমাকে নিতে আসত। দুজনে রিকশা করে সেই রাতে আমরা ছোট্ট সংসারে ফিরতাম। এরপর কোনরকম খাবারের কিছু ব্যবস্থা, নামাজ আর ঘরের টুকিটাকি কাজ শেষ করে যখন বিছানায় যেতাম তখন রাত একটা পার হয়ে যেত। এরপর আবার সেই পুরান রুটিনের সাইকেল। ঘরের কাজ বলতে দুই একদিন পরপর ঝাড়ু দিতাম। আর মাসে দুই একবার আমার মা এসে পুরা সংসার ঝেড়ে মুছে, কাপড়-চোপড় সব ধুয়ে একেবারে তকতকে করে দিয়ে যেত। মাঝে মাঝে আব্বু এসে একগাদা রান্না তরকারি দিয়ে যেত। সেসব ফ্রিজে রেখে কয়েকদিন পার করে দিতাম। সে কয়েকদিন হয়ত আমার রান্নাবান্নার ঝামেলা কম থাকত। একটু সকাল সকাল রাতে ঘুমাতে যেতে পারতাম। এই তো ! কারণ সবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও আমাদের দুজনের সাপ্তাহিক ছুটি বলে কিছু ছিলনা। ফাইয়াজের বাবার শুক্রবারও ডিউটি থাকত আর আমিও চলে যেতাম সেই ভোরে আমার হলে, টানা গাধার মত পড়ার জন্য। এতকিছুর পরেও স্বস্তি ছিল এটা যে সংসারের সব ঝামেলা আমরা দুজন মিলেই করতাম। হয়ত আমি রান্না করেছি, খাওয়া শেষে ফাইয়াজের বাবা সব প্লেট-বাটি সুন্দর করে ধুয়ে রেখেছে। হয়ত আমি ঘর ঝাড় দিচ্ছি ওদিকে সে নোংরা কাপড়-চোপড় সব ওয়াশ করছে। কখনও আমি একটু অসুস্থ হলে রান্না বান্না, ধুয়া মুছা সব সেই করেছে। আমার ফাইনাল প্রফের বিরাট ধাক্কা বেচারার উপরও গিয়েছে। 

আর হলে থেকে আমি আর আমার রিডিং পার্টনার ম্যারাথন পড়া দিতাম। দুজনই ছিলাম বিবাহিত। তাই দুজনেরই কিছু সাংসারিক ঝামেলা মিটিয়ে প্রফের প্রস্তুতি নেয়া ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এজন্য অন্য কারো সাথে আমাদের পড়াশুনার রুটিনের বিন্দুমাত্র কোন মিল ছিলনা। সবাই রাতে জেগে পড়ে,সকালে দেরি করে উঠে। আর আমরা মোটামুটি সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত টানা পড়তাম। মাঝখানে কেবল খাওয়া,গোসল আর নামাজের বিরতি। আমাদের এরকম হাভাতের মত পড়া দেখে আশে পাশে সবাই টিজ করত। কিন্তু আমরা দুজন জানতাম এরকম না পড়লে প্রফে পাশ তো দূরের কথা বসার যোগ্যতাও হবেনা। সারা বছরের জমানো মেডিসিন, সার্জারি আর গাইনির পাহাড়সম সিলেবাসের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ডাক্তার হবার জন্য এরকম পড়াশুনা ছাড়া আমাদের সেকেন্ড কোন অপশন ছিলনা। তার উপর তো ওয়ার্ডে গিয়ে গিয়ে কেতাবি জ্ঞান রোগীদের উপর একদফা ঝাড়া লাগত। হুম, এভাবেই চলছিল নতুন সংসার আর বহু কাংখিত ডাক্তার হবার চূড়ান্ত প্রস্তুতি ।

জানুয়ারির ১তারিখে ফাইনাল প্রফ শুরু হল। রিটেন শেষ হল খুব ভালভাবেই। এরপর অসপিও ভালভাবে শেষ হল। এরমধ্যে ফাইয়াজের বাবার বিসিএসের ভাইভার রেসাল্ট দিল। আলহামদুলিল্লাহ টিকে গেল। কষ্টের মধ্যেও একটু আনন্দের ছোয়া। ভালভাবেই চলছিল সব । কিন্তু ভাইভা  শুরুর কয়েকদিন আগেই আমি টের পেলাম ফাইয়াজকে আল্লাহ পৃথিবীতে আসার জন্য নির্ধারন করে দিয়েছেন। প্রেগন্যান্সি টে্সটেও পজিটিভ আসল। শুরু হল প্রেগন্যন্সির প্রথম তিন মাসের শারীরিক ধাক্কা, সাথে ভাইভার মহা টেনশান। সবমিলিয়ে এক দুর্বিসহ জীবন শুরু হল.........



চলবে...



বুধবার, ৯ মে, ২০১২

অতঃপর এক মুঠো রোদ্দুর....

এই লেখাটি পড়ার পূর্বে একটি লেখা পড়তে হবে। 
http://shetuzohra.blogspot.com/search?updated-min=2010-01-01T00:00:00%2B06:00&updated-max=2011-01-01T00:00:00%2B06:00&max-results=21

অবশেষে পাশ করেছে রুহিত। হয়ত ভাবছেন যেখানে ফেইল ব্যাপারটাই খুব ব্যতিক্রম, এ প্লাসের ছড়াছড়ি চারিদিকে সেখানে রুহিতের পাশ কি আর এমন ব্যাপার ! কিন্তু এটাই অনেক বড় একটি ঘটনা। ড.ইউনুস যখন শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পেলেন- সমগ্র বাংলাদেশ যেমন আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ল, কিংবা মুসা ইব্রাহীম প্রথম এভারেস্ট জয় করলেন সারাদেশে চরম উত্তেজনা অনেকটা সেরকম উত্তেজনার মধ্যে আছি আমি। শুধু আমি না সাথে মামুনও। কারণ আমাদের দুজনের কম্বাইন্ড স্টুডেন্ট হল রুহিত।

থার্ড ইয়ারে থাকতে যখন সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড করতে জাতীয় মানসিক হাসপাতালে প্রতিদিন যেতাম তখন সত্যিই খুব ভাল লাগত সাইকিয়াট্রি সাবজেক্ট। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মানসিক সমস্যার ইতিহাস নিতে অন্যরকম ভাল লাগত। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পার্ট ছিল কাউন্সিলিং করা। কারণ জীবন সমুদ্রে পরাজিত চরম হতাশাগ্রস্থ একজন মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব পজিটিভ দিক খুজে বের করতে হয়, সেই অনুযায়ী তাকে আশার আলো দেখিয়ে জীবন সমুদ্রে বাকি পথ পাড়ি দেবার কথা বলা এত সোজা না। আর যদি সেটা হয় দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতিনিয়ত অবজার্ভেশান করা, ফলো আপ করা তাহলে সেটা কত কঠিন বলার অপেক্ষা রাখেনা।

স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় মানসিক সমস্যাগ্রস্থ মানুষের প্রধাণ সমস্যা একটাই, সেটা হল যে ধারণা একবার তাদের ব্রেইনে সেট হয়ে যাবে সেটা থেকে বের করে আনা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। স্যার এক গল্প শুনিয়েছিলেন। ঠিক গল্প না এক কিশোরী মেয়ের ঘটনা। মেয়েটির ধারণা ছিল এক ছেলে তাকে ভালবাসে, যার জন্য সে প্রতিদিন ভোরে বাড়ির পাশেই খেলার মাঠে সেজে গুজে অপেক্ষা করত। মেয়েটির ডিলিউশান ছিল। কোন ফোন আসলে, কলিংবেল বাজলে সে ভাবত হয়ত ছেলেটিই তাকে নিতে এসেছে। এই ডিলিউশান থেকে মেয়েটিকে বের করে আনার কাউন্সিলিং প্রসেস খুব সহজ ছিলনা। খুব সহজে প্রেসক্রিপশানের পাতায় কয়েকটি ড্রাগস লিখে দিলাম, ব্যস। সেরকমও না।

ভেবেছিলাম সাইকিয়াট্রি তে ক্যারিয়ার করব। প্রথমত অনেক বেশি ইন্টারেস্ট খুজে পেতাম এই সাবজেক্টে, আর স্যারও অনেক বেশি কো-অপারেটিভ ছিলেন। সবমিলিয়ে ভালই লাগত। কিন্তু এই ক্যারিয়ার চুজিং এর চিন্তা যে সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এটা পরে বুঝেছিলাম রুহিত কে পড়াতে গিয়ে।

রুহিত বছরে দু’বার ব্যংকক যায় মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করাতে। ২০১১সালে ওর এস.এস.সি পরীক্ষা দেবার কথা ছিল। কিন্তু ওর মানসিক ভয়, টেনসান এত বেশি ছিল যে পরীক্ষা দেবার কথা ভাবতেই রুহিত আরো বেশি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শেষমেষ ওকে পরীক্ষার হলে না গিয়ে ব্যাংকক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া লেগেছিল।
২০১১সালের পুরোটা বছর খুব ধৈর্য্যের সাথে ওকে পড়ানো লেগেছে। সপ্তাহে তিনদিন কমপক্ষে তিনঘন্টা করে ওকে কাউন্সিলিং করা লেগেছে। ওকে এটাই শুধু বুঝাতে হয়েছে যে তুমি পরীক্ষায় পাশ কর আর নাই কর পরীক্ষা দেবার ফলে যে অভিজ্ঞতা হবে সেটাই অনেক বড় একটা এচিভমেন্ট।

পড়াতে গিয়েই যখন দেখতাম ও মাথা নিচু করে মন খারাপ করে বসে আছে তখন আমারও মন খারাপ হয়ে যেত। মন ভাল করার জন্য বলতাম,
- আচ্ছা রুহিত তোমার পিছনেই এক বিশাল সমুদ্র আছে, এটা তুমি বিশ্বাস কর?
- না আপু, বিশ্বাস করিনা।
- এক বিশাল পাহাড় রয়েছে, এটা বিশ্বাস কর?
- না আপু, করিনা।
- তাহলে তুমি এটা কিভাবে বিশ্বাস কর যে তুমি পরীক্ষা দিলেই ফেইল করবে। তুমি তো এখনও পরীক্ষায় দেউনি !
- আমার টেনসান হয়, খুব মেন্টাল স্ট্রেস হয় পরীক্ষার কথা ভাবলেই।
- সেটা তো আমারো হয়। তাই বলে কি আমি তোমার মত পরীক্ষা না দিয়ে ঘরে বসে ফেইল করব ভেবে আর পরীক্ষা দিইনি !
- আপু, আপনার কথা আলাদা।
- মোটেই আলাদা না রুহিত। জাস্ট পরীক্ষায় তুমি এটেন্ড কর। পাশ/ফেইল পরে চিন্তা কর।
- জ্বি.....( খুউব মন খারাপ করে, মাথা নিচু করে বসে থাকবে)

সাইকিয়াট্রিতে যাবার চিন্তা আমি বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম রুহিতকে পড়াতে গিয়ে। আসলে এত ধৈর্য্য রাখা সত্যিই খুব কঠিন। যখন আমারও পরীক্ষা চলত সেসময় নিজের পরীক্ষার চিন্তা, রুহিতের কাউন্সিলিং সব মিলিয়ে মেজাজ সবসময় ভাল থাকতনা। এরমধ্যেও বাড়িওয়ালা আন্টির খুব আন্তরিক রিকুয়েষ্টের কথা ভেবে রুহিতের কেয়ার করা লেগেছ। মনের সব কষ্ট, নিজের পরীক্ষার টেনশান চেপে রেখে হাসিমুখে রুহিতকে কাউন্সিলিং করা লেগেছে।

মানসিক সব চাপকে কিছু সময়ের জন্য চাপা দিয়ে হাসিমুখে কারও দিকে চেয়ে কিছু ফর্মালিটি রক্ষা করা হয়ত সহজ। কিন্তু অন্য একজন মানসিক সমস্যাগ্রস্থ মানুষের জীবনের গভীরে ঢুকে গিয়ে তার জীবনের একটি পার্ট হয়ে জীবনকে কল্পনা করা, তার সব না বলা কষ্টের অনুভূতির সাথে মিশে যাওয়া, অতঃপর জীবনের বেঁচে থাকার পয়েন্টগুলো খুজে বের করে হাসিমুখে সেটাই ফোকাস করা, নিছক ফর্মালিটি রক্ষার চেয়ে অনেক কঠিন।

কিন্তু এত কষ্টের পরেও ভাল লাগত যখন একদম শেষের দিকে রুহিত খুব ভাল রেসপন্স করত। যখন বড় বোন হিসেবে সে খুব কো-অপারেটিভ হয়ে উঠত আমার সাথে, অন্যরকম আনন্দে মন ভরে যেত। যখন সামনে গোল সেট করে দিতাম বাক প্রতিবন্ধি সাবেরা ইয়ামিন কে যে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ইউনিভার্সিটিতে সফলতার সাথে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছে তখন রুহিতের হৃদয়েও অন্যরকম স্পন্দন তৈরি হত। সেও আশায় বুক বাধত, হয়ত আশার তরী তারও একদিন সব গন্ডি পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত পৌছবে।

অতঃপর রুহিত এস.এস.সি তে পাশ করল। জীবনে নিজের পরীক্ষার সর্বোচ্চ রেসাল্টেও কোনদিন এত খুশি হইনি। বাসায় এসে রুহিত আমাকে,মামুনকে সালাম করল । মনের খুশি ব্যক্ত করতে গিয়ে সে বলল, 'ঈদের আনন্দ কি জানিনা। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি যে কি পরিমান অস্বাভাবিক আনন্দ মনের ভিতর হচ্ছে বলে বুঝানো যাবেনা।'

রুহিতের এই অসামান্য কৃতিত্ব আমার কাছেও মনে হচ্ছে বহুদিন ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা শেষে এক মুঠো রোদ্দুর হাসি মনের কোণে ঝিলিক দিয়ে গেল। সাথে আল্লাহর নিকট অনেক শুকরিয়া। প্রকৃতপক্ষে সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য।

ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : টিউশনি,রেজাল্ট, আনন্দ
বিষয়শ্রেণী: বিবিধ

ভাগাভাগির সংসার

আজ পাঁচদিন হল বাসায় আব্বু-আম্মু কেউ নেই। দাদী, ছোট ভাই মামুন আর আমার সংসার। এমনিতেই বাসায় খুব হইচই থাকে। যদিও ভাই-বোন মোটে দু’জন আমরা তবু বাসায় সবসময় অনেক ভাই-বোন মিলেই থাকতে হয়।
খুব ছোটবেলা থেকেই অনেক অনেক ভাই-বোনের খুব শখ আমার। কারণ একটাই, অনেক খেলা করা যাবে, আনন্দ করা যাবে। খুব ছোটবেলায় এ শখ পূরণ না হলেও বড়বেলায় এ শখ একেবারে ষোলআনা পূর্ণ হয়েছে আমার। খালাত ভাই, বোন, ফুফাত ভাই-বোন সবাই মিলে সবসময় বাসায় পাঁচ-ছয় ভাই/বোন একসাথে থাকা হয়। আর দাদী সবসময় আমাদের সাথেই। সেই ক্লাস ফাইভ থেকে এটা দেখে আসছি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এদের মধ্যে যেসব কাজিনের বিয়ে হয়ে যায় কিংবা পড়াশুনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকে যায় এর পরেই আসে নেক্সট আরেক গ্রুপের কাজিন। এভাবে করে এখনও চলছে ব্যাপারটা।

সবাই মূলতঃ পড়াশুনার জন্যই থাকার সুবিধার্থে মেসে থাকার পরিবর্তে আমাদের বাসায় উঠে। আর আমার মা, যিনি খুব অতিথিপরায়ণ এবং অতিমাত্রায় সামাজিক তাদের পড়াশুনা,থাকা-খাওয়ার সুবিধার জন্য একেবারে বাসায় রেখে দেয়। তো আল্টিমেইটলি আমার মায়ের জন্য আমরা দু’ভাই বোন অনেক ভাই বোন না থাকার ব্যাপারটা কখনই মিস করিনা।
আব্বু খুব গম্ভীর এবং রাশভারী প্রকৃতির মানুষ। খুব বেশি মানুষজন খুব একটা পছন্দ করেননা। তবু আমার মায়ের এই সামাজিকতার কাছে তার এই গম্ভীরতা খুব একটা ধোপে টিকেনা। যাইহোক বাসায় খুব হইচই এর মধ্যেও আব্বু সবসময় নিজের জগতে একাকি বিচরন করতেই ভালবাসেন এবং আমরাও কেউ তার জগতে ডিস্টার্ব করিনা। মাঝে মাঝে মনে হয় আব্বু-আম্মু পুরোপুরি দুই মেরুর মানুষ হয়েও এতকাল একসাথে সংসার কিভাবে করেছে।

জমিজমা সংক্রান্ত কাজে আব্বু কিছুদিন আগেই গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন। আমার কলেজ বন্ধ হওয়াতে আম্মাও এই সুযোগে আমাকে বাসায় রেখে নানীকে দেখতে চলে গেল। বাকি যেসব কাজিন ছিল তারাও হরতালের ফাকে ,ছুটি কাজে লাগাতে ঢাকার বাইরে নিজেদের বাড়ি চলে গেল। দুম করে পুরা বাসা একবারে ফাকা হয়ে গেল।

তো এখন সংসার পুরা আমার হাতে। রেগুলার রান্না-বান্না, ঘর গুছানো, ঝাড়ু দেয়া, দাদীর আর আমার কাপড়-চোপড় পরিস্কার করা, দাদীর যত্ন নেওয়া সব আমাকেই করতে হচ্ছে। এই প্রথম সবকিছু আমার উপর ছেড়ে দিয়ে আব্বু-আম্মু পুরাপুরি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই ছোট সংসারেও মামুন আমাকে তার সাধ্যমত ভালই সাহায্য করছে।
আম্মু চলে যাবার দিন থেকেই কাজ আমরা ভাগাভাগি করে নিয়েছি। ও পানি ফুটাবে প্রতিদিন, জগে-বোতলে পানি ভরবে, বোতলে পানি ভরে ফ্রিজে রাখবে আর বাজার করবে টুকটাক। কিন্তু প্রথমদিন কাজ করার পর দেখা গেল আমার কাজ অ-নে-ক বেশি ওর তুলনায়। তাই দ্বিতীয় দিন আবার কাজ ভাগ হল। এবার ওর এক্সট্রা কাজ হল সকালে অথবা রাতে সব প্লেট,গ্লাস,হাড়ি-পাতিল সব মেজে পরিষ্কার করবে। মামুন মেনে নিল।

তৃতীয় দিন বুঝতে পারলাম, খুব ভোরে ঘুম বাদ দিয়ে ভাত রান্না করে দাদীকে মেখে খাওয়ানো, সব ঘর গুছানো,ঝাড়ু দেবার পরে একটু পড়তে বসা। এরপর দুপুরে রান্না-বান্না ,গোসল করে, নামাজ পড়ে দাদীকে খেতে দিতে দিতে খুব টায়ার্ড হয়ে যাচ্ছি। তাই তৃতীয় দিন আবার কাজ ভাগ হল। এবার মামুনের ভাগে আরো যোগ হল ও ঘর ঝাড়ু দিবে, দুপুরে দাদীকে গুছিয়ে খেতে দিবে এবং প্লেট ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখবে। যাইহোক এতে করে আমার একটু রিলাক্স হল।

রান্না-বান্না একেবারে কিছুই পারিনা তা না। সব মোটামুটি শিখে ফেলেছিলাম কয়েক মাস আগেই। কে জানত এই রান্না-বান্নার ইন্টার্নিও আমাকে করতে হবে পুরোদমে ! এরমধ্যে আমার এক ফ্রেন্ডকে বাসায় ইনভাইট করলাম আমার হাতের রান্না খাওয়ার জন্য। বাসার কাছেই বাসা তার, তাই অফারটা সাথে সাথে লুফে নিল। দুপুরে মুরগি, বিকেলে নুডলস খাওয়ালাম ওকে। সর্বশেষে ও তো আমার এত্ত গুনে একেবারে মুগ্ধ। আগেই বলে রাখি, আমার ওই ফ্রেন্ড রান্না-বান্নার এ ব সি ডিও জানেনা। সুতরাং একেবারে যিরোর কাছে আমার পারফর্মেন্স একেবারে পিকে উঠে গেল।
আমার ভাই এত ভদ্র টাইপের না। ওকে যা বলা হবে ও সেভাবেই করবে এধরনের তথাকথিত ভদ্র সে না। কিন্তু সে এখন আমার সাথে কাজ ভাগাভাগি করে ঠিকমতই সংসার করছে। আমার ধারণা, আমি যা রান্না করছি সেটা ওর খেতে খুব ভালই লাগছে। তাই ভালমনেই সব কাজ করে যাচ্ছে। যদিও মামুন আমাকে ব্যাপারটা বলছেনা তবু আমি আন্দাযে ধরে নিচ্ছি।

চতুর্থ দিন ভাগাভাগির কাজে ভালই দিন কেটে গেল। এবার আর কারো কোন অভিযোগ নেই। বিকেল বেলা দুজন মিলে গল্প করলাম। ছোটবেলার কিছু স্মৃতিচারণ করলাম...বেশ সুন্দর, মিষ্টি এক বিকেল হল আমাদের দু’ভাই-বোনের।

পঞ্চম দিন কিছু বই আনতে আমি কলেজে গেলাম। রাস্তায় খুব জ্যাম আর বাস/রিকশা পেতে অনেক দেরি হওয়ায় কলেজে পৌছলাম অনেক দেরি করে। ফলে কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে তিনটার বেশি বেজে গেল। মোবাইলে মামুনকে মেসেজ পাঠালাম ভাত রান্না করে, আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি করতে। ফ্রিজে ডাল ছিল ওটা গরম করতে বললাম। বাসায় এসে দেখি ও সব ঠিকমত করে রেখেছে, নিজের ভাগের কাজ তো করেছেই সাথে দাদির কাপড় পরিস্কার করে নেড়ে দিয়েছে, দুপুরে নিজে রান্না করে দাদিকে খেতে দিয়েছে। সব একেবারে পারফেক্টলি করেছে। আমিও খুব খুশি হয়ে গোসল করে ওর রান্না করা ভাত্, ডিম ভাজি, আলু ভর্তা আর ফ্রিজ থেকে গরম করা ডাল দিয়ে পেট ভরে খেলাম।
বিকেলে এবার মামুন বলছে, ‘ আজকে তো সব কাজ আমার ভাগেই দিয়ে দিলি!’ আমিও সাথে সাথে বললাম, দেখেছিস তাহলে আমার কাজগুলো কত কষ্টের।
একেবারে মিনা কার্টুনের মত গড়গড় করে বাকিটুকুও বললাম...... ষষ্ঠদিন থেকে চল আমরা দুজন কাজ এক্সচেইঞ্জ করি। তোর কাজ আমি করব আর আমার কাজ তুই করবি। কিন্তু এবার আর ও রাজি হলনা। অলরেডি বুঝে গিয়েছে আমার ভাগের কাজ ওর চেয়ে কষ্টের।

সবকিছু ভালই চলছিল। মিনা কার্টুনে দেখাত যে পরিবারের সবাই ছেলে হওয়াতে রাজুকে বেশি গুরুত্ব দেয়। মেয়ে হিসাবে মিনা বঞ্চিত। এমনকি মিনার দাদিও রাজুর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করত। কিন্তু আমাদের বাসায় ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রে উলটো হত। অবশ্য অনেক ভাই-বোন একসাথে থাকার সুবাদে কেউ গুরুত্ব কম বেশি পাবার কোন স্কোপ আসতনা। কিন্তু আজ বাসায় আসতেই যখন দাদি বলল, আজ মামুন সব কাজ করেছে। তখনই মনে হল মিনার দাদির মত হয়ে গেল না তো ব্যাপারটা ! আমি প্রতিদিন সব করছি, কিন্তু আজ মামুন করতেই দাদি খুব স্পেশালি আমাকে জানান দিল।
কি জানি !!

কবে আমাদের এই ভাগাভগির সংসার সমাপ্ত হবে জানিনা। কারণ আব্বু-আম্মু কেউই কবে আসবে এ ব্যাপারে কিছুই বলছেনা।কিন্তু একেবারে খারাপ যাচ্ছেনা আমাদের দু'ভাই-বোনের এই ভাগাভাগির সংসার........
ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : রান্না-বান্না, সংসার
বিষয়শ্রেণী: ব্লগর ব্লগর

প্রশান্ত হৃদয় !



মেঘলা দিনে কি কারো মন খারাপ থাকতে পারে? মনের যত দুঃখ, ক্ষোভ, আক্ষেপ, না পাওয়ার হতাশা সব বৃষ্টির অঝোর ধারায় ধুয়ে মুছে একেবারে বিলীন হয়ে যায় না?

তীব্র গরমের পর বিকেলে যখন আকাশ কালো করে চারিদিক অন্ধকার হয়ে উঠে তখন মনের কোনায় এক চিলতে আনন্দ ঝিলিক দেয়। এখনি নামবে বৃষ্টি। হিমেল হাওয়া বইবে। চারদিক ঠান্ডা হয়ে যাবে। এক শীতল পরশ চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। এই পৃথিবীটা অনেক সুন্দর।অ-নে-ক.. শুধুমাত্র এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা উপভোগ করার জন্য হয়ত পৃথিবীকে আমি সবসময় ভালবাসব। কিংবা খুব ভোরের ঝুম বৃষ্টির শব্দে যখন ঘুম ভেঙ্গে যায় সেই ঘুম ভাঙ্গা মুহূর্তে নিশ্চুপ চারদিকের বৃষ্টিভেজা ভোরের জন্য পৃথিবীকে অ-নে-ক বেশি ভালবাসব।



নাহ! শুধু বৃষ্টি না। অথই, উন্মত্ত সাগরের উথাল পাতাল ঢেউ এর গর্জনের মধ্যেও যে অদ্ভুত এক ধরনের হৃদয় ছুয়ে যাওয়া অনুভূতি আছে সেটার কি কোন তুলনা হয়? সামনে বিশাল জলরাশির সামনে যখন একাকি আনমনে কিছুক্ষন বসে থাকি তখন সৃষ্টির সব সৌন্দর্য মনে হয় কেবল এই সাগরের মধ্যেই ঢেলে দেয়া হয়েছে। মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠে। এত্ত ভাললাগা অনুভূতির ভিতরেও কেমন যেন শূণ্যতা তৈরি হয়।



এই সাগরের ঢেউ আর সাথে যদি রাতের আকাশে হাজার তারার মেলার মাঝে চাঁদের আলোয় চারপাশের অন্ধকার এক ধরনের আলো-ছায়াময় মায়াবি পরিবেশ সৃষ্টি করে তখন কেমন লাগে? মনে হয়না, ইশ! এই পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য যে দেখেনি সে ভালবাসার অর্থও বুঝেনি।
চাঁদের আকর্ষনে জোয়ার-ভাটা হয়। জোয়ার ভাটা কি কেবল সাগরেই হয়? মনের ভিতর যে উত্থাল পাতাল ঢেউ জীবনের সব আকাঙ্ক্ষা,প্রত্যাশা আর না পাওয়ার হিসাবকে একেবেরা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় সেটার জন্যও কি হৃদয়ে জোয়ার-ভাটা হয়না? শরীরের ৭০ভাগই পানি। তাই হয়ত চাঁদনী রাতে আমাদের হৃদয়মনেও একধরনের জোয়ার-ভাটা হয়। সেই জোয়ারে জীবনের ফেলে আসা সব কিছু ভাসিয়ে কেবল সামনের দিকে যাবার অনুপ্রেরণা দেয়না আমাদের?

শরতের আকাশের স্নিগ্ধতা আর ঘন কাশফুলের স্নিগ্ধতার সাথে মিশে যাবার অনুভূতি কেমন? মনে হয় সাদা মেঘের সাথে আমিও ভেসে বেড়াই সারা আকাশ জুড়ে।



কিংবা শীতের সকালে ঘন কুয়াশার চাদরে ঘেরা পৃথিবীকে কেমন লাগে? সবকিছুকে খুব রহস্যে ঘেরা মনে হয়না ! কুয়াশা ঢাকা সকাল যখন সূর্যের হাসিতে আলোকিত হয় তখন এক মুঠো রোদ্দুরের যে প্রতীক্ষায় অপেক্ষারত মন তা অজান্তেই নেচে উঠে না !

সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তে কার কথা বেশি মনে পড়ে? বৃষ্টিমুখর দিনে কাকে বেশি কাছে পেতে চায় মন। সেই প্রিয়জনের সাথে কাটানো পু্রোনো স্মৃতিই সেই বৃষ্টিমুখর দিনকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেনা ! ইচ্ছা করেনা, প্রিয়জনের সাথে কোন এক সুন্দর বিকেলে দূর-বহুদূর হেটে যেতে। পাশে থাকবে সারি সারি গাছের ঘন ছায়া আর মন জুড়ানো হিমেল হাওয়া। কিংবা কোন এক চাঁদনী রাতে নৌকার উপর দুজনে বসে চাঁদ দেখা আর সারারাত গল্প করা। ইচ্ছা করেনা?



এত সৌন্দর্য চারপাশে। এত মাধুর্য চারদিকে। আর কিছু লাগে মন ভাল করার জন্য? সব দুঃখ-কষ্টকে খুব তুচ্ছ মনে হয় তখন। সীমাহীন ভাললাগার অনুভূতিতে হৃদয় ছেয়ে যায়। কিন্তু এতকিছুর পরেও ঠিক কোথায় যেন এক শূন্যতা থাকে। ঠিক বুঝানো যায়না, কিন্তু অনুভব করা যায়। এত ভাল লাগার মধ্যেও হৃদয়ের প্রশান্তি আসেনা সেই শূণ্যতার জন্য।

হৃদয়ের প্রশান্তি খুজে বেড়াই পাগলের মত। এই অসীম মায়াময় সৌন্দর্যে ঘেরা জগত খুব স্পষ্টভাবেই কি যেন আমাদের হৃদয়ে অনুভব করাতে চাই। সেই অনুভূতির ক্লাইমেক্সে যেতে পারিনা বলেই হয়ত একধরনের শূণ্যতা অনুভব হয়। প্রশান্তি আসেনা।

বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ হৃদয়ে যে ছন্দ তৈরি করে, চাঁদনী রাত মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা যে বেদনাকে ভুলিয়ে দেয়, বিশাল সীমাহীন সমুদ্রের গর্জন হৃদয়ে যে জোয়ার আনে এসব কিছু কি এমনি এমনিই হচ্ছে? এসব মায়াময় সৌন্দর্য কি কেবল আমাদের জীবন, ফেলে আসা অতীত আর আগত ভবিষ্যতের হাতছানির দিকেই ইশারা দেয়? জীবন তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। জীবনের ক্যনাভাসের এসব অসাধারণ চিত্র কি শুধুই ক্যামেরায় বন্দি করে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে আনন্দ পাবার জন্য? ফটো তুলে ক্যাপশানে লিখলাম, Life is really beautiful. ব্যস এটুকুই? অন্তরের পিপাসা এতে মিটেনা। তৃষ্ণার্ত হৃদয় খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাই বলে উঠে উদ্দেশ্যবিহীন এরকম নশ্বর ভাললাগার অনুভূতি নিয়ে এত মাতামাতি কিসের?



কুরআনে এই নশ্বর মায়াবী সৌন্দর্যের অনুভূতির ক্লাইমেক্স কিভাবে অর্জিত হয় সেটা এত নিখুতভাবে বর্ণিত হয়েছে,

“যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠনাকৃতি নিয়ে চিন্তা- ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন। (তারা আপনা আপনি বলে ওঠেঃ) “হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে সৃষ্টি করো নি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত।কাজেই হে প্রভু! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করো।” সূরা-আল ইমরান

অচিরেই হৃদয়ের শূণ্যতা কেটে যায়। এক গভীর প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। আমাদের চারপাশ, প্রকৃতি, আকাশ, পৃথিবী, বৃষ্টি, সাগর, চাঁদ, জ্যোৎস্না সবকিছুই অনুভূতির এই ক্লাইমেক্সে না আসা পর্যন্ত শূণ্যতা রয়ে যায়। এত্ত মায়াবী সৌন্দর্যে ঘেরা পৃথিবীর এই না বলা অমোঘ, চির শাশ্বত সত্য উপলব্ধি না করা পর্যন্ত এই শূন্যতা কাটেনা। অনন্ত অসীম এই সুন্দরের যিনি সৃষ্টিকর্তা তার নিকট সবিনয়ে আত্মসমর্পন না করা পর্যন্ত হৃদয়ে প্রশান্তি আসেনা।

তাই বার বার বলতে ইচ্ছা করে “হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে সৃষ্টি করো নি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত।কাজেই হে প্রভু! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করো।”
ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : প্রশান্ত হৃদয়, সুন্দর প্রকৃতি,পৃথিবী
বিষয়শ্রেণী: বিবিধ

হারানো আকাশ !


https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhB65N-OY__vuCWLh1UDfhT2my9fanypdqns6sYxm9Zx5_ZCVgZbnjfjtEwPeQC7zF0-dHowPOhd2-6arStYwezo4vBzYBwkCUAtOzyt3oICWbZ0VYGHd7roUw2bxW-Fb5cY18IFyxGkk0b/s1600/kapal.jpg

শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই প্রিয়তমা স্ত্রীকে ডেকে বললেন, তোমার কাছে যে মূল্যবান অলংকার রয়েছে সেটা হয় সরকারি কোষাগারে জমা দাও নয়ত আমাকে ত্যাগ কর। বুদ্ধিমতি স্ত্রী সাথে সাথে সমস্ত অলংকার সরকারি কোষাগারে জমা দিল।

শাহী বাসভবনে প্রবেশ করলেন শাসক। বংশের সকল লোক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কি কি উপহার এবার তারা পাবে,কেননা প্রতিবার শাসন ক্ষমতা বদলানোর পরেই বংশের লোকেরা শাহী বাসভবন হতে প্রচুর উপহার পেয়ে থাকে। কিন্তু শাসক শাহি বাসভবনে প্রবেশ করেই সকল সম্পত্তি সরকারি কোষাগারে দান করলেন। সবাই তীব্র ক্ষোভ ও রাগ নিয়ে বিদায় নিল।

প্রিয় বন্ধু শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। বন্ধুত্বের খাতিরেই সরকারি কোষাগার থেকে প্রাপ্য অর্থ আদায় করতে বন্ধুর কাছে আগমন। একটি শাহী ফরমান দেখিয়ে বন্ধুকে বলল, এটা পূর্বের শাসক হতে প্রাপ্ত যেখানে সে সরকারি কোষাগার হতে বিপুল পরিমান অর্থের দাবিদার। সব দেখে শাসক বন্ধুকে বলল, সরকারি কোষাগার জনগনের সম্পদ, পবিত্র আমানত। সেখান হতে কিভাবে পূর্বের শাসকের এই শাহী ফরমান দেখে তোমাকে অর্থ দেই যেখানে পূর্বের শাসকরা ন্যয় বিচার করে এই শাহী ফরমান লিখে যাননি ? বন্ধু বিষন্ন হৃদয়ে ফিরে গেল।

চাচাত ভাই এসে দাবি করল, পূর্বের সকল শাসক সরকারি কোষাগার হতে বংশের সকল লোকের জন্য ভাতা বৃদ্ধি করে গিয়েছে তাই তার ভাতাও যেন এবার বৃদ্ধি করা হয়। শাসক তাকে খুব ধীর স্থির ভাবে বললেন ভাই, আমি তো কেবল আমার বংশের লোকের জন্য শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইনি ! বরং আমার পূর্ববর্তী যারা তোমাদের অন্যায়ভাবে কেবল স্বজনপ্রীতিমূলকভাবে জনগনের সম্পদ হতে অতিরিক্ত ভাতা দিয়ে গিয়েছেন সেটা আজ থেকে বন্ধ করে দিলাম।

অনেক অভিযোগ নিয়ে ফুফু এসেছেন শাসকের নিকট দেখা করতে। ভাতিজা কে বললেন তোমার পূর্বে তোমার বাবা, চাচা আমার জন্য যে ভাতা বরাদ্দ করে গিয়েছিলেন সেটা নাহয় তুমি বৃদ্ধি করলেনা, কিন্তু বরাদ্দকৃত ভাতা কমালে কেন? খুব শ্রদ্ধার সাথে এবার শাসক ফুফুকে বললেন, সাধারণ জনগন যে ভাতা পাবে আপনিও তাই পাবেন। সরকারি কোষাগার হতে জনগনের সম্পদ আপনাকে দিয়ে তো আমি আপনাকে সুখী করতে পারিনা !

চাচাত ভাই এসে রাজনৈতিক মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করল। বলল, বংশের লোকেদের অখুশি করে তো শাসন ক্ষমতায় বেশিদিন থাকতে পারবেনা। তারচেয়ে বরং আমাদের যে ভাতা দেয়া হত সেটাই নির্দিষ্ট থাকুক, সেটা তোমার আর বৃদ্ধি করা লাগবেনা। সব শুনে শাসক বললেন আল্লাহর নিকট আমি সমগ্র জনতার সামনে অপমানিত হওয়াকে খুব ভয় করি। শাসক হবার মত কন্টকপূর্ণ জীবন আর হয়না। ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতা থাকে কিন্তু শাসকের জীবনে কোন স্বাধীনতা থাকেনা। কারন শাসক কোন ব্যক্তি নয় পুরা জাতি। সাধারণ মানুষ যে অবস্থায় থাকবে আমাকেও আজ সেই অবস্থায় থাকতে হবে। রাজনৈতিক চালকে ধূলায় মিশিয়ে দিলেন শাসক। চাচাত ভাই ক্ষুব্ধ মনে ফিরে গেল।

ব্যক্তিগত যত সম্পত্তি বংশানুক্রমিকভাবে শাসক পেয়েছিলেন সব বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা দিলেন। শুধুমাত্র একান্ত ব্যক্তিগত একটি জায়গীর রেখে দিলেন যা থেকে খুব সামান্যই আয় হয়। সরকারি কোষাগার হতে শাসক হিসেবে প্রাপ্য ভাতাও তিনি গ্রহন করতেননা। কারণ তার যে ব্যক্তিগত জায়গীর রয়েছে, ওতেই তার হয়ে যাবে। শুধু শুধু কোষাগারের উপর চাপ বাড়িয়ে কি লাভ!

ওমর বিন আব্দুল আজিজ ছিলেন ঠিক এরকমই একজন শাসক। যিনি খলিফা হয়েই পূর্ববর্তী সব খলিফাদের অন্যায়,যুলুম,অত্যাচার, অবিচারের নিষ্কাশন করেছিলেন।

একবার সাধারণ এক লোক ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের বংশের কোন এক লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলল তার জমি দীর্ঘদিন ধরে অন্যায়ভাবে দখল করেছে সে। ওমর তার বংশের লোককে এর কারণ দর্শাতে বললে সে জমির দলিল নিয়ে দেখাল এটা পূর্বের খলিফা তাকে দিয়ে গেছে। এবার ওমর তাকে বললেন যদি এমন কোন অবস্থা দাঁড়ায় যে একজন আব্দুল মালেকের দলিল দেখাচ্ছে অন্যজন মারওয়ানের দলিল দেখাচ্ছে সেক্ষেত্রে কোনটা গ্রহন করা উচিত? সাথে সাথে বংশীয় লোক জবাব দিল পূর্বের দলিল অর্থাৎ মারওয়ানের দলিল গ্রহন করা উচিত। ন্যয়পরায়ন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ বললেন আমিও সবচেয়ে পুরান দলিল- কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী এই জমি ওই সাধারণ লোককে দিয়ে দিলাম।
http://www.kalamullah.com/img/ibnmajah.gif

ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ, ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম। যিনি উমাইয়া বংশের সেই খলিফা যে উমাইয়া বংশীয় সকল পাপ-পংকিলতার উর্ধে থেকে একেবারে স্বতন্ত্র ও সঠিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ইসলামিক ইতিহাসের কিছু পার্ট আমি সবসময় এভয়েড করে যাই। বনু হাশেমী ও বনু উমাইয়া গোত্রের পারস্পরিক বিরোধের যে লজ্জাজনক ঐতিহাসিক পরিণতি তা আমি বরাবরই এভয়েড করি। কিন্তু হঠাৎ করে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের জীবনী পড়তে খুব আগ্রহ হল। আগ্রহের প্রধাণ কারণ ছিল উমাইয়া গোত্রের লোক হয়ে, মারওয়ানের পৌত্র হয়েও কিভাবে তিনি এতটা স্বতন্ত্র ছিলেন?
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEg_C-dg1weksuDzboTPbD2mfcqp9BGMyPAXb8yStAyOkxSS2ySXIjLY_HQuwhMP3xc8oxCx2TB5JjPSpcPOSXv12ltziYWC6Jc8IJJc5ae73hUbQr8rzsjBB-38nz9Hv27e9Wg0taB29-sF/s1600/fondillo_1920x1200.jpeg
খুব গভীরভাবে ব্যপারটা খোঁজার চেষ্টা করি। ঠিক একজায়গায় এসে কিছুটা মানসিক তৃপ্তি পেলাম । ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ, যার মাতা ঊম্মে আসেম। উম্মে আসেমের দাদা ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ)। এক্ষেত্রে একটি ঘটনা না উল্লেখ করে পারছিনা।

হজরত ওমর (রাঃ) যখন খলিফা ছিলেন তখন একবার রাতে সাধারণ জনগনের অবস্থা সফরকালে এক বিধবার ঘরে এসে শুনতে পেলেন বিধবা এবং তার মেয়ের কথোপকথন। সেসময় দুধে পানি মিশানো ওমর(রাঃ) নিষেধ করে দিয়েছিলেন। বিধবা দুধে পানি মেশাতে চাইলেও মেয়ে কিছুতেই পানি মিশাতে দিবেনা। বিধবা তার মেয়েকে বলল, এখন তো ওমর দেখছেনা, পানি মেশালে কি হবে? কিন্তু মেয়ে বলল, ওমর হয়ত দেখছেনা যে দুধে পানি মিশাচ্ছি কিন্তু ওমরের আল্লাহ তো দেখছেন ! এই কথোপকথনে মুগ্ধ হয়ে ওমর (রাঃ) তার পুত্র আসেমের সাথে বিধবার কন্যার বিয়ে দেন। খলিফা ওমর (রাঃ) কেবল দ্বীনি গুনে মুগ্ধ হয়েই এটি করেন, উচ্চবংশ না নিম্ন বংশ এটা একেবারেই পাত্তা দেননি। পরবর্তীতে এই ঘরেই জন্মগ্রহন করেন উম্মে আসেম যাকে বিবাহ করেন মিশরের শাসক আব্দুল আজীজ ইবনে মারওয়ান।

এতো গেল ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের বংশ পরিচয়। এরপর যেটা পড়ে আরো বেশি মানসিক তৃপ্তি পেলাম সেটা হল ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের বাল্যজীবন ও পড়াশুনা। তিনি মদিনায় প্রতিপালিত হয়েছেন মাতামহের গৃহে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর তাঁকে নিজ হাতে লালন পালন করেছেন, আরবি ভাষা-সাহিত্য শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ওবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবাকে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের অন্যতম শিক্ষক নিযুক্ত করেন। অন্যদিকে পিতা আব্দুল আজীজও পুত্র ওমরের সঠিক শিক্ষার জন্য মদিনায় তার জন্য মাসিক দিনার বরাদ্দ করেছিলেন। ফলস্বরূপ উমাইয়া বংশের উত্তরাধিকারী হয়েও ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের বাল্যজীবন, কিশোর ও শিক্ষা-দীক্ষা সরাসরি দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর পরিবার হতেই পরিচালিত হয়েছিল।

ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের উপর তার শিক্ষকের কিরূপ প্রভাব বিরাজ করত সেটার একটি ঘটনা উল্লেখ করি। উমাইয়া বংশের সকল লোক হযরত আলী (রাঃ) ও তার পরিবারবর্গকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করত। ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ একদিন বংশের ধারা অনুযায়ী হযরত আলী (রাঃ) এর নামে কিছু কটু কথা বলেন। এটি শুনে ওবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা রাগ করে ওমরকে বলেন, “ তুমি কবে থেকে অবগত হলে যে আল্লাহ বদরবাসীদের উপর সন্তুষ্ট হবার পর পুনরায় অসন্তুষ্ট হলেন?” ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইলেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন কখনও এরকম আর করবেননা।
ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের বাল্যজীবন, কিশোর, শিক্ষা-দীক্ষা ,পরিবেশ ও শিক্ষকের ভূমিকা এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সেটা তাকে উমাইয়া বংশ থেকে একেবারে পৃথক করে দিয়ে স্বমহিমায় মহিমান্বিত করেছিল।

এইতো সেই ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ, যাকে বলা হয় দ্বিতীয় ওমর, উমাইয়া বংশের একমাত্র নক্ষত্র যাঁকে ইতিহাস অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরন করে।
http://t2.gstatic.com/images?q=tbn:ANd9GcSrDwi-ToBul_L-vsvcmjsdrqjynZlgPSpGG2rtMY2Q8WYT1J0afSFv-aFX
বর্তমান যুগের শাসকদের দূর্নীতি, অন্যায়-অবিচার দেখে দেখে যখন মন খুব বিষাক্ত হয়ে উঠে তখন এধরনের স্বর্ণালি জীবনী আশার আলোকে এখনও জিইয়ে রাখে। হয়ত কোন একদিন এমন কোন শাসক আসবেন যেদিন সুরঞ্জিতের মত মন্ত্রীরা জনগনের টাকা নিয়ে লুটপাট করবেনা, রাতের আধারে কেউ নৃশংসভাবে খুন হবেনা, বিনা অন্যায়ে কেউ শাস্তি পাবেনা। এখনও আশা রাখি কোন এক ওমর আসবেন যিনি জনগনের কাতারে নেমে যাবেন, ব্যক্তিগত সুখ বাদ দিয়ে সাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহন করবেন। আর ধীরে ধীরে আমাদের হারানো আকাশ আবার দীপ্তিময় হয়ে উঠবে.....