বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

প্রজন্ম

১.
বর্তমানে যে বাসায় আছি সেখানে যেদিন প্রথম আসি লিফটে খুব হাস্যোজ্জল এক আংকেলের সাথে পরিচয় হয় । আলাপচারিতায় জানতে পারলাম উনি আমাদের ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন । খুব আনন্দের সাথে উনি জানালেন তার ওয়াইফ এবার গল্প করার সঙ্গি পাবে । অনেকদিন ফ্ল্যাটটি ফাকা ছিল বিধায় তার ওয়াইফ খুব নিঃসঙ্গ অনুভব করতেন ।
যাইহোক পরবর্তিতে জানতে পেরেছিলাম আংকেল পাকস্থলির ক্যান্সারে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন, সাথে ছিল ডায়াবেটিস । একদিন উনার কাগজপত্র ঘাটাঘাটি করে দেখলাম উনার ক্যান্সার ছিল এমন পর্যায়ে যা অপারেশানের উপযুক্ত না । কিছুই খেতে পারতেন না তিনি । যা খেত তাই বমি হয়ে যেত। উনার মৃত্যুর শেষ কয়েকটা মাস উনি কেবল ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইডের উপর বেচে ছিলেন । প্রায়ই সময় আমাকে যেতে হত উনার শিরায় ফ্লুইড চালু করে দেবার জন্য । জীবনে রিজিক আল্লাহ উনাকে ভরপুর করে দিয়েছেন । ব্যাঙ্কে টাকা পয়সা অগণিত । দুই ছেলের নামে দুইটা ফ্ল্যাট কিনবেন বলে মনস্থির করেছেন । মৃত্যুর আগেও উনি কেবল স্ত্রী,সন্তান নিয়ে চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত থাকতেন । কিন্তু ফ্ল্যাট কিনে দেবার পূর্বেই একদিন আল্লাহর ডাকে উনি পরপারে পাড়ি জমান ।
উনার মৃত্যুর ঠিক চল্লিশ দিন পর চল্লিশা অনুষ্ঠানে বিল্ডিং এর সবাইকে দোয়া করার উদ্দেশ্যে দাওয়াত করা হয় । বাসায় হুজুর এনে কুরআন শরীফ খতম দেওয়ানো হচ্ছে । আমার বাবা গেলেন দোয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে । বাসায় গিয়ে আংকেলের দুই ছেলেকে নিয়ে একসাথে দোয়ার উদ্দেশ্যে ডাকলেন । বড় ছেলে বাসায় ছিলনা, ছোট ছেলে এসে জানাল তার খুব মন খারাপ । আমার বাবা আর বাকি হুজুর সবাইকে মন ভরে দোয়া করতে বললেন । এরপর মাগরিবের আযান দিয়ে দিল । আব্বু আবার ছোট ছেলেকে ডাকতে গেলেন । ছোট ছেলে এবারও জবাব দিল, ‘ আংকেল আপনারা মসজিদে গিয়ে আব্বুর জন্য দোয়া করবেন ,ওতেই হবে ।‘ এরকম জবাবে আব্বু তো পুরাই তাজ্জব হয়ে নামাজ পড়তে চলে গেল ।

২.
এক পরিচিত আন্টির স্বামী মারা গেলেন । মারা যাবার মাসখানেক পর দেখি আন্টি ছেলে-মেয়ে নিয়ে স্টার সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখতে যায় মন ভাল করার উদ্দেশ্যে । ছেলে-মেয়েরা ফেইসবুকে ছবি আপলোড দেয় মা কে নিয়ে । বাবাকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণমূলক কথা লিখে । বাবার ছবি আপলোড দিয়ে ছবির ক্যাপশানে লিখে “ বাবা তোমাকে ছাড়া কোথাও যেতে ভাল লাগেনা , তুমি যেখানেই থেক ভাল থেক “। কমেন্টে বন্ধুরা সান্ত্বনা দেয় । বন্ধুরা লিখে R.I.P Uncle. যদিও কারও মৃত্যুতে ইন্নানিল্লাহ পড়ার নিয়ম কিন্তু এই R.I.P এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে । অতঃপর প্রতি বছর বছর মৃত্যু দিবসে হুজুর ডেকে কুরআন শরীফ খতম করিয়ে পালিত হয় ।

৩.
জীবনে একবার একজন মৃত্যুপথযাত্রী মেয়ের চিকিতসা খরচ ঊঠানোর উদ্দেশে এক মুভি শো তে গিয়েছিলাম । জানতাম না এব্যাপারে কিছুই। কাছের ফ্রেন্ডরা সবাই যাচ্ছে বিধায় আমিও গেলাম । মুভি শো এর টিকিটের সব টাকা দিয়ে সেই মেয়ের চিকিতসা খরচ বহন করা হবে । এই নিয়ে ফেইসবুকে ইভেন্ট খোলা হয়েছিল । এরপরের অভিজ্ঞতা ছিল খুব তিক্ত । মুভি শো তে ছেলে মেয়েরা খুব আয়েশ করে মুভি এনজয় করছে । মাগরিবের আযান দিয়ে দিল, কোন বিরতি নেই । দিব্যি সবাই মানবিক তাগিদে একজনের চিকিতসা খরচ দেবার জন্য মুভি দেখার উসুল আদায় করছে । উঠে গেলাম ওখান থেকে। সোজা বাসায় । সুস্থ করার মালিক যিনি তাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কেবল টাকা দিয়ে একজনের সুস্থতা কামনা করার মত বোকামির জন্য নিজেকেই বারবার ধিক্কার দিলাম । আর কাউকে যদি সাহায্য করতেই হয় তাহলে কেন সেটা মুভি দেখে উসুল করতে হবে? এরকম আরো অনেক অনেক ইভেন্ট দেখেছি ফেইসবুকে। কনসার্ট, মুভি কোনটাই বাদ নেই । গান,বাজনা,সিনেমা দেখে সাদাকা করার এই নিউ থিম কোথা থেকে এল আমি আজও বুঝতে পারলাম না ।
মৃত্যুর পর যে আমল সবসময় জারি থাকে তার মধ্যে অন্যতম হল সন্তানের দোয়া । কিন্তু সেই সন্তান যদি হুজুর ডেকে দোয়া পড়িয়ে তার দায়িত্ব শেষ করে তাহলে বাবা-মায়ের বিন্দুমাত্র উপকার আসেনা । যে বাবা-মা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানের ভালর জন্য সারাজীবন এত পরিশ্রম করে গেলেন তার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কি কেবল ফেইসবুকে বন্ধুদের নিয়ে মন ভাল করার উদ্দেশ্যে মুভি দেখতে গেলেই শেষ হয়ে যায় ? আমরা কি বাবা-মা কে ভালবাসি? সত্যিই যদি ভালবাসি তাহলে তাদের হক আমরা কতটুকু আদায় করছি? আল্লাহর কাছে দোয়া করি এরকম সন্তান যেন আমরা না হই আর এরকম সন্তান যেন আমাদের না হয় ।

একটি সমাজ, অত:পর তার বোঝা.....

সবেমাত্র তখন ৩/৪ দিন হল নতুন এক ক্লিনিকে জয়েন করেছি । জুনিয়র এক ইন্টার্নের অহর্নিশ অনুরোধের ফলে ওই ক্লিনিকে ডিউটি করা । ক্লিনিকের হালচাল বুঝতে না বুঝতেই একদিন সকালে তিনজন লোক আমার চেম্বারে প্রবেশ করে ।
১ম জনঃ বাচ্চা নষ্ট করাতে চাই ।
আমিঃ এখানে বাচ্চা নষ্ট করা হয় না ।
১ম জনঃ যত টাকা লাগে আমি দিব ।
আমিঃ আচ্ছা ... টাকা পয়সা দিয়ে এসব আমি ম্যানেজ করিনা । আপনি অন্য জায়গায় ট্রাই করেন ।
এই কথা শুনে তিনজন লোক ঊঠে পাশের রুমে গেল ক্লিনিক মালিকের সাথে কথা বলতে । প্রায় ঘন্টাখানিক তারা কথা বলে সেদিন চলে গেল ।

২য় দিন
পুনরায় ওই তিনজন লোকের প্রবেশ আমার রুমে । টেবিলে কয়েকটা ইনভেষ্টিগেশানের কাগজ রাখল । খুব বিনয়ের সাথে প্রথম জন বলল-
- ম্যাডাম ,খুব বিপদে পড়েছি। একটু সাহায্য করেন ।
- কিঞ্চিত একটু নরম স্বরে বললাম, কি বিপদ ?
- আসলে ডাক্তারের কাছে কোন কিছু লুকাতে নেই । তাই বিনা সংকোচে বলছি, আমার ওয়াইফের পেটে যে সন্তান সেটা আসলে আমার সন্তান না । এজন্য বাচ্চা নষ্ট করাতে চাই ।
- স্ট্রেঞ্জ !! আপনার সন্তান না সেটা আপনি কিভাবে বুঝতে পারলেন ?
- আমি মাঝখানে দেশের বাইরে ছিলাম । প্রায় ১৫ দিনের বেশি । বিদেশে থেকেই জানতে পারি আমার ওয়াইফ একজনের সাথে পালিয়ে বান্দরবান চলে গেছে । এরপর যখন দেশে আসি তার পরের মাসে শুনি সে প্রেগন্যান্ট । তাহলে এই বাচ্চা কিভাবে আমার হয় বলেন ?
- ঘটনা এটুকু শুনে আমি পুরাই তাজ্জব । বললাম, আপনি সব জেনেও আপনার ওয়াইফ কে কেন ডিভোর্স দিচ্ছেন না বলুন তো ?
- আমার বাড়ি নারায়নগঞ্জ । বাবা প্রভাবশালী লোক । আমার শশুরও ওই এলাকার প্রভাবশালী লোক । আমি ডিভোর্স দিলে আইনি জটিলতায় ফেলে দিবে আমার শশুরবাড়ির লোকেরা ।
- বিয়ে হয়েছে কত বছর ?
- ৫বছর ।
- খুব আশ্চর্যের সুরে বললাম, এই পাচ বছর আপনি সংসার কিভাবে করলেন ?
- এর মাঝখানে আমার ওয়াইফ আরো বেশ কয়েকবার অন্য ছেলের সাথে পালিয়ে গেছিল । অনেক কষ্টে বুঝিয়ে ফেরত এনেছি । আসলে ভালবাসার বিয়ে তো !
- লোকটির কথা শুনতে শুনতে আলট্রাসনো রিপোর্টে হাত দিলাম । রিপোর্ট দেখেই আমার চোখ ছানা বড়া । বললাম, পেটে বাচ্চার বয়স ৬মাস প্লাস হয়ে গেছে । এই বাচ্চা কোণভাবে মুখে ওষুধ খাইয়ে নষ্ট করা সম্ভব না ।
- ম্যাডাম দেখেন না এমন কোন ওষুধ আছে কিনা !
(হঠাত মনে হল লোকটির সাথে এত কথা বলছি অথচ যার বাচ্চা নষ্ট করাবে সেই মহিলাই তো আসেনি । আর সাথে আরো দুজন যে লোক বসে তারাই বা কে ? )
জিজ্ঞেস করাতেই প্রথমজন হাসি মুখে জবাব দিল ওই দুজন তার আপন ছোট ভাই । আর তার ওয়াইফকে আনেনি কারণ তার ওয়াইফ বাচ্চা নষ্ট করতে চাইনা । যা করার গোপনে করতে হবে ।
ঘটনাতে মজা পেলাম কিছুটা । যদিও নারায়ঙ্গঞ্জ শুনে একটি ভীতও হলাম । এবার বললাম,
- দেখেন ভাই, এই বাচ্চা এখানে নষ্ট করা যাবেনা । প্রথমত বাচ্চা পেটের মধ্যে অনেক বড় হয়ে গেছে । তারউপর বাচ্চার মা রাজি না । বাচ্চার মায়ের কনসেন্ট ছাড়া নষ্ট করলে অনেক বড় আইনি জটিলতায় পড়তে হবে । তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল বাচ্চা এভাবে নষ্ট করা খুব গুনাহ ।
- আইনি জটিলতা আমি ম্যানেজ করব । আর যত টাকা লাগে আমি দিব ম্যাডাম । আপনি কেবল কাজটা করে দিন ।
- স্মিত হাসি দিয়ে বললাম , দেখেন ভাই আপনি আইনি জটিলতার ভয়ে এরকম ওয়াইফের সাথে আপনি ৫বছর সংসার করে আসছেন, ডিভোর্স দিতে ভয় পাচ্ছেন । সেই আপনাকে কোন ভরসায় ক্লিনিক কতৃপক্ষ ভরসা করবে ? ততক্ষনে আমার ডিউটি টাইম শেষ । আমি ঘড়ি দেখে বের হবার জন্য তাড়া করছি ।
- ঠিক আছে ম্যাডাম, তাহলে আপনার সাথে এটা নিয়ে আবার বসব আমি ।
আমার তখন ছেড়ে দে মা কেন্দে বাচি অবস্থা । ক্লিনিকের মালিক দিদিকে বললাম, এই কেইস আমি ডিল করবনা । আপনি যেভাবে পারেন রেফার্ড করবেন । দিদি দেখলাম কিছুটা নিমরাজি টাইপ অবস্থা ।
পরে ভাবলাম, ক্লিনিকে আমি কোন পাওয়ার খাটাতে পারবনা । এখানে টাকা দিলে সব ওকে হবে । আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম এই ক্লিনিক চাকরি আর না । কয়েকটা শিডিউল ডিউটি শেষ হলেই আমি বাচি ।
কিন্তু ঘটনা তখন আসলে শুরুই হয়নি সেটা বুঝলাম পরদিন সকালে ।

৩য় দিন
১ম জনঃ ম্যাডাম, আপনার জন্যই অনেকক্ষন ওয়েট করছি ।
- আমার জন্য ওয়েট করার কি আছে । ডিউটি ডাক্তার আর কেউ ছিলনা ?
- না আসলে আপনার সাথে বলেই বেশি স্বাচ্ছন্দ ফিল করছি । মুখে ওষুধ ছাড়া আর কি উপায়ে বাচ্চা নষ্ট করা যায় ?
- স্যালাইনে ওষুধ দিয়ে কৃত্তিম লেবার পেইনের মাধ্যমে ।
- আমি তো গত ৩মাস ধরে আমার ওয়াইফকে এন্টাসিড সিরাপের মধ্যে সাইটোমিস ওষুধ গুলিয়ে খাওয়াচ্ছি । এতে কেন কাজ হল না ?
- কি বলেন? ৩মাস ধরে সাইটোমিস খাওয়াচ্ছেন? এটা খাওয়ানোর বুদ্ধি কার কাছে পাইলেন?
- ফার্মেসির লোকেরা বলল, এটা খাওয়ালে নাকি বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায় । কই বাচ্চা তো নষ্ট হল না !
- প্রথম তিনমাস খাওয়াননি তো তাই নষ্ট হয়নি । যাইহোক ,ভাই যা হবার হয়ে গছে । আপনার ওয়াইফ কে ৫বছর এভাবে সহ্য করতে পারলে, নিষপাপ মাসুম বাচ্চা আর কি দোষ করল বলেন ? মেনে নিয়ে শান্তিমত সংসার করেন ।
- মেনে তো নিতাম । কিন্তু পেটের বাচ্চা তো ছেলে । পরে আবার আমার সম্পত্তির ভাগিদার হবে । যেখানে আমার বাচ্চা না, সেখানে কেন তাকে আমি সম্পত্তির ভাগ দিব ? আর শান্তিমত সংসারের কথা বলছেন ? ওটা আর হবেনা । আমি দেশ ছেড়ে চলে যাব । কিন্তু এই বাচ্চা নষ্ট না করে যেতে পারছিনা ।
- কেন কেন ??
- প্ল্যান ছিল, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরবনা । কিন্তু এই বাচ্চাই সব ঝামেলা বাধাল ।
- কিভাবে ?
- বুঝলেন না ! আমি বিদেশে গেলে তো আমার শশুর বাড়ির লোকেরা এই বাচ্চা নিয়ে মামলা করতে যাবে ? অনেক অনেক ব্যাপার আছে ,সব বলে বুঝানো যাবে না । শুধু এই বাচ্চা নষ্ট করলেই আমি খালাস ।
- বললাম, এই বাচ্চা তো আপনার না । আপনার ভয় কিসের ? যদি মামলা করে তাহলে আপনি সুযোগ পাবেন প্যাটার্নিটি টেস্ট করে আপনার মিথ্যা পিতৃত্বের সমুচিত জবাব দিতে ।
- মামলা করলেই তো আমাকে জেলে ঢুকাবে ।
- কয়েকটা দিন জেল খাটলে কি আসে যায় বলেন !
- আমার বিরুদ্ধে আসলে আরো অনেক কেইস আছে, একবার জেলে ঢুকলে আমি অন্য কেইস নিয়ে ফেসে যাব ।
এমনিতেই আমি এসব ফালতু ব্যাপার ডিল করতে চাইনি । কিন্তু কিঞ্চিত ভয় পেয়ে এতক্ষন ধরে উনার কথা শুনতে হয়েছে । এবারের কথা শুনে আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম । গতদিন ক্লিনিক মালিকের কাছে শুনলাম ক্লায়েন্ট নাকি এলাকার প্রভাবশালী মাস্তান । সুতরাং বুঝে শুনে সেভাবে ব্যাপারটা মিমাংসা করতে হবে ।
সেদিনের মত ডিঊটি ইস্তফা দিয়ে আসলাম ।

৪র্থ দিন
- ম্যাডাম বললেন না তো কিভাবে আমাকে আপনি সাহায্য করবেন?
- দেখেন ভাই , একমাত্র ন্যাচারালি এবরসন ছাড়া এই বাচ্চা মুখে ওষুধে নষ্ট হবেনা ।
- ন্যাচারালি এবরশন বলতে কি বুঝাচ্ছেন ?
- এই ধরেন বাথরুম থেকে স্লিপ কেটে পড়ে গেল কিংবা সিড়ি থেকে পড়ে গেল এরকম ।
- আচ্ছা, এর আগে তো আমি এরকম ট্রাই করেছিলাম । বাথরুমে সাবানের ফোম দিয়ে স্লিপারি করে রেখেছিলাম । পড়েনি । বাইকে করে ইচ্ছা করে এক্সিডেন্ট করেছিলাম । বাইক থেকে পড়েও তার কিছু হয়নি ।
- তাহলে আর কি ! আমার কাছে আর কোন ওয়ে নাই ।
- আচ্ছা বাচ্চা হবার পর পর বাচ্চা কে মেরে ফেলা যায় না ?
- শুনেই আকাশ থেকে পড়লাম । কি বলেন আপনি ? এরপর অবশ্য মনে মনে ভাবলাম জীবনে কয়টা মার্ডার করেছে আল্লাহই জানে । শুধু শুধু তো আর প্রভাবশালী গুন্ডা হয়নি ।
- দেখেন আমি খুব নিরুপায় । আমাকে সাহায্য করলে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব ।
- আচ্ছা, একটা ব্যাপার ক্লিয়ার হতে পারছিনা । আপনি বললেন শুধু বাচ্চার জন্য আপনি দেশের বাইরে যেতে পারছেন না । কেন আপনার ওয়াইফ কি আপনি বিদেশে পালিয়ে গেলে বিয়ের কাবিন নিয়ে মামলা করতে পারবে না ?
- বিয়েই তো করিনি, কাবিন আসবে কোথা থেকে ? স্যরি, আসলে আপনাকে সত্য বলতে দ্বিধা নেই । তাই সব স্বীকার করেই ফেললাম ।
- মানে এই ৫বছর বিয়ে ছাড়াই সংসার করেছেন । তার মধ্যে আপনার গার্ল ফ্রেন্ড আরো কয়েকবার অন্য ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে ।
- আসলে সে অনেক লম্বা ইতিহাস । মেয়েটা তখন নেশা করত । এই আমি তাকে নেশার জগত থেকে ছাড়িয়ে এনেছি ।

এটুকু বলার পর আমার আর শুনার রুচি হলনা । বললাম, ভাই আপনি যা কিছুই করতে চান আপনি ক্লিনিক মালিকের সাথে কথা বলেন । এটা সমাধান করা আমার এখতিয়ারের বাইরে ।
পরে আর ওই ক্লিনিকে যাওয়া হয়নি । যারা উপরের লেখাটা পড়ে ভাবছেন আমি এই ঘটনার জন্য ক্লিনিক ছেড়ে দিয়েছি তবে ভুল ভাবছেন । উপরের ঘটনাটা ছিল সেই গাধার উপর অর্পিত অগনিত বোঝা যার ফলে সামান্য খড়ের ভার সহ্য করতে না পেরে গাধা টা মারা গিয়েছিল ।

হুম , এরকম আরো বহু কেইস ক্লিনিকে ফেইস করেছি । ঘুনে ধরা সমাজের ঘুন গুলোকে প্রতিনিয়ত নিজ চোখে এভাবে প্রত্যক্ষ করেছি । যখন সমাজ আর এই ঘুনের ভার সহ্য করতে পারেনা তখন টি.এস.সি তে পহেলা বৈশাখে ঘটে যাওয়ার মত নির্লজ্জ, অবর্ণনীয় ঘটনা অবলীলায় ঘটে যায় ।

সিনেম্যাটিক ডাক্তারি!


প্লাষ্টিক সার্জারিতে যখন ডিউটি ছিল
তখন মনের গহীনে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে চরম
উতসাহে ডিউটির প্রথম দিন
হাসপাতালে গিয়ে দেখি সেদিন ওটি ডে।
তখন ছিল রোজার ঈদের ছুটি শেষ হবার প্রথম
কার্যদিবস। স্বাভাবিক ভাবে অনেকেই
আসেনি। আমাকেই ফার্স্ট এসিস্ট
করতে হবে ওটিতে। তাই দাড়িয়ে গেলাম।
বাংলাদেশের স্বনামধন্য একজন প্লাস্টিক
সার্জনের সাথে ওটি করার মধ্যেই ভাবলাম
এটাই সুযোগ নিজের সব কৌতুহল মেটানোর।
স্যারকে বললাম, প্লাস্টিক
সার্জারি করে কি নিজের
চেহারা বদলে ফেলা সম্ভব? স্যার
তো আমার প্রশ্ন শুনে খুব
একটা হাসি দিয়ে বলল সিনেম্যাটিক
মেডিকেলে সম্ভব কিন্তু বাস্তবে না।
হা হা হা। মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় কত
নাটক সিনেমা দেখতাম
সেখানে নায়িকা চেহারা বদলে একেবারে ভিন্ন
মানুষ হিসেবে আবির্ভাব হত। সবই
নাকি প্লাস্টিক সার্জারির কেরামতি!
আচ্ছা এরকম বহু মিসকনসেপশান
আমরা সিনেমা, নাটকে পেয়ে থাকি। চলুন
দেখি কি কি.....
১.প্লাস্টিক
সার্জারি করে সিনেমাতে যে অহরহ
চেহারা বদলানো।যায় এটা বাস্তবে কখনই
সম্ভব না। চেহারার কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন
সম্ভব যেটা সিনেমার তুলনায় খুবই নগন্য।
২. আচ্ছা,যমজ ভাই কিংবা বোন আঘাত
পেলে নাকি অন্যজনও ব্যথা টের পায়।
জানিনা এই থিওরি সিনেমার ডিরেক্টর
কেমনে কোথায় পেল? একজন আঘাত
পেলে অন্যজন কেমনে টের পাবে?
মেকানিজম কি অনারেবল ডিরেক্টর স্যার?
৩.খুব খুব কমন একটি বাংলা সিনেমার দৃশ্য
হল ডাক্তার সাহেব এসে মহিলার হাত ধরেই
বলে দেয় যে সে প্রেগন্যন্ট। পালস দেখেই
যদি প্রেগন্যান্সি টেস্ট কনফার্ম করা যায়
তাইলে আর আমরা গাইনিতে এতদিন এত এত
পরীক্ষা কেন শিখলাম!
৪.ওহ!
প্রেগন্যান্সি ব্যাপারটিকে মুভিতে আরো গুরুত্ব
বুঝানোর জন্য প্রায়ই বলা হয় দশ মাস দশ
দিন পেটে ধারণ করা মায়ের চোখের জল
ছেলে বুঝলনা। আহা! দশ মাস দশ দিন
হলে তো পোস্ট ডেটেড প্রেগন্যান্সি। প্রকৃত
হিসাব হল নয় মাস সাতদিন।
তাহলে চিন্তা করে দেখেন পুরা একমাসের
হিসাবের গন্ডগোল দিয়ে সিনেমা এখনও
বহাল তবিয়তে জনপ্রিয়তা পেয়ে যাচ্ছে।
৫. কোন এক তুমুল জনপ্রিয় গানে দেখেছিলাম
অন্ধ নায়িকাকে ভালবাসার মোহে নায়ক
তার দুই চোখ দান করে নিজে অন্ধ হয়ে যায়।
আরে ভাই থামেন। বাস্তবে দুই চোখ কেউ
দেয়না আর একচোখ দিলে কেউ অন্ধ
হয়ে যায়না। হয়ত ভাবছেন নায়ক
নায়িকাকে বেশি ভালবাসে তাই দুই চোখ
তো দিতেই পারে। না ভাই,
মেডিকোলিগ্যাল ব্যাপার গুলা অত্যন্ত
জটিল।কেউ চাইলেই দুই চোখ দান
করতে পারবেনা।
৬. কিডনি দান করে বন্ধু মারা যায় এমন
অহরহ ব্যাপার সিনেমাতে কত দেখায়! আর
বন্ধুর কিডনি নিয়ে নায়ক
কিংবা নায়িকা দিব্যি সুখে দিন কাটায়।
আহ! বাস্তব যদি এমন হত! যে কিডনি দান
করে তার কিন্তু বাস্তবে কোন সমস্যা তেমন
হয়না। একটা কিডনি নিয়ে সে দিব্যি জীবন
পার করে দিতে পারে।
সমস্যা হয় যে কিডনি নেয়। কারন
ইমিউনিটি দমিয়ে রেখে কিডনি শরীরে প্রতিস্থাপন
অনেক প্যারার ব্যাপার। আর
সেটা সাকসেসফুল হলেও যে রোগীর
সমস্যা হবেনা এমন বলা টাফ।
অথচ সিনেমাতে পুরাই উল্টা দেখাচ্ছে।
রোগী বেচে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে আর
বেচারা কিডনিদাতা মরে যাচ্ছে।
৭. সিনেমাতে কেন যেন সবার ব্লাড গ্রুপ
নেগেটিভ হয়। আচ্ছা তাও নাহয় হল।
দেখা যায় নায়ক-
নায়িকা হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে শুয়ে একজন
আরেকজন কে রক্ত দান করছে। নায়কের শরীর
থেকে রক্ত
এন্টি গ্রাভিতে উপরে গিয়ে ব্যাগে জমা হয়
আর সেই ব্যাগ থেকে রক্ত সাই সাই
করে নিচে নেমে নায়িকার শরীরে প্রবেশ
করে। আহা! পুরাই এক ঢেউ এর মত ভালবাসার
কার্ভ তৈরি হয়।
বাস্তবে কি হয় জানেন? একজনের রক্ত
নিয়ে সব পরীক্ষার পর ওকে হলে ডোনারের
রক্ত টানা হয়। এরপর সেই রক্ত রিসিভার
কে আলাদাভাবে দেয়া হয়।
এখানে পাশাপাশি বেডে শুয়ে রক্ত দেবার
রোমান্টিসজম পুরাই ডিরেক্টরের
কল্পনাপ্রসূত ভুয়া কাহিনী।
৮.সবচেয়ে লেটেস্ট মিসকনসেপসান
হচ্ছে ক্লোনিং নিয়ে।
বাংলা মুভিতে এটা এখনও আসেনি মনে হয়।
ব্যাপার না। অনন্ত জলিল নিয়ে আসবে হয়ত
খুব শিঘ্রি।
মুভিতে যেটা দেখায় তা হল বিরাট এক
বিজ্ঞানি যে নিজের ক্লোনিং করতে চায়।
সে বিশাল এক ল্যাবের মধ্যে কফিন টাইপ
কিছু একটার মধ্যে ঢুকে যায়। এরপর ল্যাবের
অপর সাইডের বাক্স থেকে সেইম আরেকজন
এডাল্ট ক্লোনিং হয়ে বের হয়।
অনেকটা কপি-পেষ্টের মত।
এদের যদি বিন্দুমাত্র মেডিকেলের
এ,বি,সি জ্ঞানও থাকত তাইলে এরকম
গাজাখুরি কনসেপ্ট বানানো সম্ভব
হইতো না।
ক্লোনিং করতে গেলেও যে মায়ের
গর্ভে তাকে লালিত পালিত হতেই হবে!
এরকম কোন বাক্স আজ পর্যন্ত আবিষ্কার
হয়নি যার মধ্যে কৃত্তিম
উপায়ে বাচ্চা উতপাদন করা যাবে।

(আর আপাতত মনে পড়ছেনা।
পরে মনে হলে এড করে দিব।)

প্রফেশনাল!

১.
পাশের বিল্ডিং এর বাড়ির কর্মসহযোগী মহিলা আমার কাছে প্রায়ই আসে অসুস্থতার জন্য চিকিতসা নিতে। একবার আসল হাইপারসেনসিটিভিটি টাইপ- ১ নিয়ে।
চিংড়ি, বেগুনের ঝোল খেয়ে একেবারে তুলকালাম অবস্থা। চুলকানি সাথে সারা মুখ ফুলে গেছে। সব দেখে আর হিস্ট্রি শুনে চিকিতসা দিয়ে দিলাম।
দুদিন পর সেই একই সমস্যা নিয়ে আবার তিনি হাজির। বললাম, ওষুধ খেয়ে কমেনি? উত্তর জানাল না। খুবই কনফিউসড হয়ে গেলাম। একটু উতসুক হয়ে তাকে তার ওষুধ গুলা আনতে বললাম।আমি তাকে তিনটি খাবার বড়ি লিখে দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন তিনি আমাকে তার ওষুধ গুলা দেখালেন সেখানে মাত্র একটি বড়ি।
খালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার বাকি দুটা ওষুধ কই গেল? জানাল, ওষুধ কেনার জন্য গৃহকর্তীর কাছে যখন তিনি টাকা চাইতে গেলেন তখন সেই গৃহকর্তী প্রেস্ক্রিপশান দেখতে চাইলেন। উল্লেখ্য গৃহকর্তীর এজমার সমস্যা আছে, এজন্য তিনি স্টেরয়েড খান ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী।
যাইহোক আমার লেখা প্রেসক্রিপশান দেখে বললেন তিনটে বড়িই কেনা লাগবেনা।শুধু চুলকানির জন্য যে এন্টিহিস্টামিন দিয়েছিলাম সেটা কেনার টাকা দিলেন। সাথে খালাকে বুঝিয়ে দিলেন যে বাকি দুটার একটা হল গ্যাসের ওষুধ, আরেকটা হল শ্বাসকষ্টের ওষুধ যা উনার জন্য অপ্রযোজ্য।
বুঝলাম যে স্টেরয়েড আর এন্টিআলসারেন্ট প্রেসক্রিপশান থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে। তাই বুঝলাম দুদিন পর একই সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আগমনের হেতু।
ভাবছি এখন থেকে চিকিতসা দেবার পর প্রতিটা ওষুধের ক্লিনিক্যাল ইন্ডিকেশান যুক্ত বইয়ের পাতাগুলা প্রেসক্রিপশানে এটাচ করে দিব।
বাংগালিরা যেহেতু সবাই ডাক্তার সেহেতু তারা পড়াশুনা করেই ডাক্তারি বিদ্যা ঝাড়ুক।

২.
বয়স্ক এক মহিলা, পাশের বাসার আন্টির শাশুড়ি। নানাবিধ সমস্যা। প্রেসার, ডায়াবেটিস আর হার্টের রোগ। মাঝে মাঝেই আমার কাছে আসে বিভিন্ন ব্যাপারে পরামর্শ নিতে।
হার্টের সমস্যার জন্য দীর্ঘদিন ধরে এসপিরিন খেতেন। সম্প্রতি তার কাশি আর শ্বাস কষ্টের জন্য একজন হার্ট স্পেশালিস্ট দেখান। নতুন প্রেসক্রিপশানে পুরানো ওষুধ চেঞ্জ করে নতুন ড্রাগ লিখে দেন।
আমার কাছে আসার হেতু এত এত বড় ডাক্তার দেখায় তবু তার রোগ সারেনা। আমি উনার চিকিতসার ফাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করে বললাম স্যার অনেক ভাল ওষুধই তো প্রেস্ক্রাইব করেছেন। কাজ তো করার কথা।
যথারীতি আমি উনার ওষুদের বক্স ঘেটে দেখলাম এসপিরিন খাচ্ছেন আর চেঞ্জ করে দেয়া ক্লপিডগরেল বক্সে নাই। জিজ্ঞেস করলাম নতুন প্রেসক্রিপশান অনুযায়ী যে ড্রাগ দিয়েছে সেটা কই?
জানাল, ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়েই পরিচিত এক ফার্মেসিতে গেছিল ওষুধ কিনতে। দোকানদার খুব আন্তরিকভাবে নাকি জানাল যে এসপিরিন দামে কম, হার্টের জন্য ভাল। ক্লপিড আর এসপিরিন তো একই ওষুধ কিন্তু অনেক দামি, শুধু শুধু দাম দিয়ে কেনার দরকার কি? এসব শুনে তিনিও সরল মনে এসপিরিন কিনেই চলে এসেছেন।
সব কথা শুনে মনে মনে বললাম ফার্মেসির দোকানদারের কথাই যখন শুনবেন তাইলে এম.ডি, এফ.সি.পি.এস করা স্পেশালিস্টের কাছে কেন দৌড়াইছিলেন?

৩.
মোবাইলে এক আত্মীয়ের সাথে কথা হচ্ছিল, তার প্রেগনেন্সি রিলেটেড শারীরিক অসুবিধার জন্য আমার কাছে পরামর্শ চাইল। সমুদয় সব বৃত্তান্ত শুনে এস.এম.এসে তাকে ওষুধ লিখে দিলাম।
পরদিনই আত্মীয়ার স্বামী আমাকে জানালেন নাপা যেখানে নিষিদ্ধ সেখানে তার প্রেগন্যান্ট স্ত্রীর জন্য আমি কিভাবে এটা প্রেস্ক্রাইব করলাম? বুঝলাম ঘটনার আদ্যোপান্ত।
ভাবছি চারপাশে সফদার ডাক্তারে ঠাসা এই দেশে এত্ত আনপ্রফেশনাল আমি কবে প্রফেশনাল হব???

শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৩

হাটি হাটি পা পা......




পাঁচ বছরের ছেলে আবির। বাবা-মায়ের খুব আদরের সন্তান। খুব কিউট চেহারা। একটি অনুষ্ঠানে সব মায়েরা যেখানে গল্প করে সেখানে আবিরের মা খুব গর্বের সাথে অন্য এক ভাবিকে বলছে তার ছেলে সিনেমার নায়কের মত বিকেলে খেলতে গিয়ে কোন মেয়েকে ফুল দিয়েছে। এটা শুনে সবাই হাসছে আর আবিরকে আদর করে অনেকেই বলছে একদম নায়কের মত হবে দেখতে। সব মেয়েরা পিছনে ঘুরে বেড়াবে।
ঘটনাটা খুব সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্তু এই পাঁচ বছরের বাচ্চার নিজস্ব জগতে ঘটনাটা মোটেই সাধারণ না। পরিবার, পরিবেশ কিভাবে একজন বাচ্চাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে সেটার উপর ব্যাসিস করেই এই সিরিজ লেখা চলবে। আমাদের বাবা-মায়ের ভূমিকা কতটুকু এবং বাচ্চাকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনটা নেগেটিভ ও পজিটিভ সেটাই এই সিরিজে ফুটে উঠবে ইনশয়াল্লাহ।
শিশুদের জগত আর আমাদের বড়দের জগত একেবারেই আলাদা। আমরা বড়রা যখন একটি শিশুকে ধীরে ধীরে বড় হতে দেখি তখন যদি এই শিশুর জগতের সাথে একেবারে মিশে না যাওয়া যায় তাহলে শিশুদের নিজস্ব জগতের হাসি,কান্না, আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জগতে বিরাট আলোড়ন ঘটে যায়। একটা নেগেটিভ ইম্প্যক্ট নিয়ে শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
আচ্ছা বাচ্চাদের জগতের সাথে আমাদের জগতের পার্থক্য কোথায়?
বাচ্চাদের ব্রেইনের গঠন শুরু হয় মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় যখন তার বয়স মাত্র তিন সপ্তাহ। বাচ্চা পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই তার কিছু প্রাইমারি ব্রেইন গঠন পূর্ণ হয়ে যায়। যেমনঃ কান্না করা, হাত-পা নাড়াচাড়া, ফিডিং রিফ্লেক্স, আই কন্ট্যাক্ট ইত্যাদি। বাচ্চাদের ব্রেইনের সাথে বড়দের ব্রেইনের পার্থক্য হল বাচ্চাদের ব্রেইন অনেক বেশি ইম্প্রেসনেবল। অর্থাৎ তাদের যত ইনপুট দেয়া তারা সেটাকেই ক্যাপচার করবে। কিন্তু আমাদের কোন ইনপুট দেয়া হলে আমরা সাথে সাথেই সেটা ক্যাপচার করবনা। আচ্ছা আপনার খুব অভ্যাসগত বিষয়কে কেউ যদি এখন বদলে দিতে চায় সেটা কি আপনি মেনে নিবেন? নিবেননা। কিন্তু বাচ্চাদের এই ইম্প্রেসনেবল ব্রেইন যেকোন ইম্প্রেসন সাথে সাথেই তাদের ব্রেইনের নিউরনে সিন্যাপ্স তৈরি করে ফেলবে। ফলে যত ধরনের ইনপুট আপনি দেননা কেন এতে বাচ্চা মোটেই বিরক্ত হবেনা।
ব্রেইনের পরিপূর্ণ গঠন নির্ভর করে জেনেটিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর । একটু সহজভাবে বুঝিয়ে বলি। একটি টেলিফোন লাইনের কথা চিন্তা করেন। যেখানে সব ডিজিট নির্দিষ্ট ও নেটওয়ার্ক কতটুকু পর্যন্ত কাজ করবে সেটাও নির্দিষ্ট। কিন্তু আপনি এই টেলিফোন লাইন দিয়ে কিভাবে আপনার নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করবেন, কাদের সাথে কথা বলবেন, কি কাজে কথা বলবেন সবই অনির্দিষ্ট। জেনেটিক ব্যাপারটা ঠিক টেলিফোন লাইনের ডিজিট ও নেটওয়ার্কের মত, এখানে কারো কোন হাত নেই। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিবেশ হল এই টেলিফোন আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন সেটা নির্ধারণ করে।
জন্মের পরপরই ব্রেইনে নিউরনের সংখ্যা থাকে প্রায় ১০০বিলিয়ন। বাচ্চা যখন ধীরে ধীরে বড় হয় তখন এই নিউরনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়না বরং এক নিউরনের সাথে আরেক নিউরনের সংযোগ বৃদ্ধি পায় যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় সিনাপ্স। এই সিনাপস্পই মূলতঃ শিশুর ব্রেইনকে ধীরে ধীরে পরিবেশের সাথে ম্যাচিউর করে তুলে। সিনাপ্সের কার্যকারিতা নির্ভর করে মায়েলিনেশানের উপর। মায়েলিনেশান হল পরিবেশের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেবার যোগ্যতা। অর্থাৎ একটি বাচ্চাকে যখন আপনি কোন কমান্ড করবেন তখন সেটা প্রথমে সে শুনবে এরপর এই কমান্ড তার ব্রেইনে গিয়ে আপনার কমান্ডকে প্রোসেসিং করে কি করতে হবে সেটা নির্দিষ্ট করবে, এরপর বাচ্চাটি আপনার কমান্ড অনুসরন করবে। এই যে এত ধীর গতিতে বাচ্চাটি কাজটি করবে এটার কারণ হল দূর্বল মায়েলিনেশান। অর্থাৎ এক নিউরনের সাথে আরেক নিউরনের সংযোগ বৃদ্ধি পাবেনা যদিনা মায়েলিনেশান ঠিকমত না হয়।
শিশুদের ব্রেইনের সিনাপ্স তিন বছর বয়সে প্রায় ৮০%, পাঁচ বছর বয়সে ৯০% পূর্ণ হয়ে থাকে। বয়ঃসন্ধিতে সিনাপ্স প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এজন্য একজন বাচ্চাকে ছোটবেলা থেকে যে ভাষায় শিক্ষা দিবেন ঠিক সে ভাষাই সে সুন্দরভাবে রপ্ত করে ফেলবে। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পর যে ভাষা সে শিখবে সেটার কিছু দুর্বলতা থাকবে। যেমন বাংলা ভাষার একজন শিশু যখন বয়ঃসন্ধির পর ইংরেজি ভাষা শিখবে হয়ত সে ব্যাকরণ, শব্দভান্ডার, কথা বলা সবই শিখতে পারবে কিন্তু উচ্চারনগত একটা বাঙ্গালিয়ানা ভাব থেকেই যাবে। ইংরেজদের মত করে উচ্চারন হবেনা কিছুতেই। আসলে বয়ঃসন্ধির পর ব্রেইনের ইম্প্রেসনেবল ক্যপাবিলিটি ধীরে ধীরে কমে যায়। সিনাপ্স পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই নতুন কিছু শেখা মানেই পুরান কিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুছে যাওয়া।
যাইহোক ব্রেইনের কার্যক্ষমতা আসলে ইলেক্ট্রিক্যাল সারকিটের মত। যত বেশি পরিবেশের সাথে ব্রেইন পরিচিত হবে তত বেশি নিউরনাল সার্কিট তৈরি হবে। বাচ্চাদের এই সার্কিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জন্মের পরপরই বাচ্চার সাথে মা কথা বলছে, গান গেয়ে শুনাচ্ছে, বিভিন্ন গল্প করছে এতে করে বাচ্চা কথা কিছু না বুঝলেও তার নিউরনাল সার্কিট তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই সে কোন ব্যাকরন, শব্দভান্ডার ছাড়াই কেবলমাত্র শুনে শুনে সে কথা বলা শিখে যাবে।
বয়সভেদে শিশুদের ব্রেইনের ম্যাচিউরিটি বিভিন্ন হয়ে থাকে। একেক বয়সে শিশু একেকরকম ভুবন গড়ে তোলে তার নিজের মধ্যে। এই ভুবন গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি যারা ভূমিকা রাখেন তারা হলেন পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোন প্রমুখ। এই ভুবন গড়ে তোলার মুহুর্তে যদি বাচ্চাকে আমাদের অজান্তেই নেগেটিভলি আমরা স্টিমুলেশান দেই তাহলে সেটার পরবর্তি ফলাফল হবে খুব অপ্রত্যাশিত।
ছয় মাসের বাচ্চা কিংবা দুই বছরের বাচ্চার সাথে যদি সঠিক প্যারেন্টিং গাইডলাইন না থাকে তাহলে বাচ্চার মানসিক, শারীরিক উভয়ই মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই শিশু লালন-পালন বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন ও আগ্রহী হওয়া খুব জরুরি।

বুধবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৩

কষ্টের সাথেই স্বস্তি (২)

অবশেষে প্রফ শেষ হল ফাইয়াজের বাবা ঢাকার বাইরে ক্লিনিকে গেল জব করতে আর আমি চলে আসলাম বাবা মায়ের কাছে ততদিনে আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত প্রফের ধকল মনে হচ্ছিল তখনও যায়নি তবুও প্রশান্তি এটুকু ছিল যে ফাইনাল প্রফ অবশেষে শেষ হল বাবার বাসায় আসার পর সর্বপ্রথম আমার খুব অপরাধবোধ হচ্ছিল এটা ভেবে যে ফাইয়াজ পেটে আসার পর অতিরিক্ত টেনশানে প্রথম ভেবেছিলাম এমআর করব কিনা ( আল্লাহ মাফ করুক) বাবার ওখানে পাশের এক আপু এসেছিল, যে গত কয়েক বছর ধরে কনসিভ করছে কিন্তু এবরশন হয়ে যাচ্ছে এজন্য সেই দম্পতি খুব মনোকষ্টে ছিল আমার কাছে এসেছিল ভাল একজন গাইনি ডাক্তারের খোজ নিতে তাদের ঘটনা শুনে আমার অপরাধবোধ আরো বেড়ে গিয়েছিল ভাবছিলাম আল্লাহ আমাকে এত বড় একটা উপহার না চাইতেই দিয়ে দিল, আর আমি কিনা সেজন্য শুকরিয়া পর্যন্ত আদায় করলাম না!

প্রফের রেসাল্ট দেয়ার পূর্বে আমার টেনশান এত বেশি হচ্ছিল যে ঠিকমত কারো সাথে কথাও বলতে ইচ্ছা করতনা মেজাজ সবসময় খিটখিটে হয়ে থাকত তার উপর একা একা সংসার সামলানো আমার জন্য পুরাই অসম্ভভ হয়ে পড়ছিল রান্না ঘরে গেলেই বমি হত কিছু খেতে গেলেও বমি এমতাঅবস্থায় যদি রেসাল্ট খারাপ হয় তাহলে এই শরীরে আবার কিভাবে সাপ্লি দিব !! সাতপাচ অনেক কিছু ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম বাবা-মায়ের সাথে একসাথে বাসা নিয়ে থাকব আমার শাশুড়ি,ননদ কেউই ঢাকায় থাকেনা তাই প্রফের রেসাল্টের কিছুদিন আগেই বাসা শিফট করে আমার হাসপাতালের কাছে বাবা-মায়ের সাথে নতুন বাসায় উঠলাম এরপর এক বিকেলে প্রফের রেসাল্ট বের হল এবং আমার রিডিং পার্টনার প্রথমেই ফোন করে আমাকে কংগ্রাচুলেশান জানাল যে আমি ডাক্তার হয়ে গিয়েছি সেই মুহূর্তটা যে কি পরিমান আনন্দের ছিল ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা সত্যি কথা বলতে কি আমার তখন মনে হচ্ছিল ফাইয়াজের সুবাদেই আল্লাহ আমাকে সাপ্লি দেবার মত অনেক বড় বোঝা থেকে মুক্তি দিয়েছে তারউপর বাবা-মায়ের সাথে বিয়ের পরেও একসাথে থাকার যে উসিলা সেটাও ফাইয়াজের কথা ভেবেই আসলে আল্লাহ মানুষের জন্য যা প্ল্যান করেন সেটাই উত্তম যদি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা যায়

আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে ফাইয়াজকে পেটে নিয়ে যখন মেডিসিন ভাইভা দিতে যাই তখন কেবলই মনে হচ্ছিল প্রফের মত পার্থিব আজাব মনে হয় আর কোন কিছু হয়না আমার লং কেইস ছিল একজন এসাইটিস(পেটে পানি জমা) এর পেশেন্ট তার উপর হিস্ট্রি,পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে আমার বমি চলে এসেছিল কোনরকম এন্টিএমেটিক খেয়ে পরীক্ষাটা শেষ করেছিলাম সার্জারী পরীক্ষায় পুরা হল জুড়ে ছিল এক ভয়ার্ত নিরবতা কারণ সার্জারী ডিপার্টমেন্টাল হেডের চিল্লাচিল্লিতে সবার ত্রাহি অবস্থা লং কেইস, শর্ট কেইস শেষে যখন স্যারের কাছে ভাইভা দিতে যাব তখন কেবলই মনে হচ্ছিল পাশ-ফেইল যাইহোক এই ভয়ার্ত নিরবতা থেকে আমি মুক্তি পেতে চাই ভাইভাতে স্যারের বকাবকি ছাড়াই আমি উতরিয়ে গেলাম,আলহামদুলিল্লাহ আর গাইনি বরাবরি আল্লাহর রহমতে ভাল পরীক্ষা হল সবমিলিয়ে আমার তখন কেবল একটাই অনুভূতি, বিরাট সমুদ্র ছোট তরী নিয়ে সুন্দর ভাবে পাড়ি দেবার রহমত ফাইয়াজের জন্যই তাই যারা কেবল ক্যারিয়ারের জন্য বিয়া,সংসার,বাচ্চা-কাচ্চা নিতে ভয় পায়, আমার ধারণা তারা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে রহমতের অংশটুকু মিস করে যায়

এরপর শুরু হল ইন্টার্নি পেশাগত ডাক্তার হবার প্রথম ট্রেইনিং অনেকেই তখন আমাকে ইন্টার্নি করতে নিষেধ করল বাসায় রেস্টে থাকতে বলল কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি হাসপাতালে  যাওয়া, রোগী দেখা, ডাক্তার হিসেবে নিজের হাসপাতালে বিচরণ করার লোভ সামলাতে পারছিলাম না আর ততদিনে আমার সেকেন্ড ট্রাইমেস্টার চলছিল পুরাপুরি সুস্থ ছিলাম, শারীরিক-মানসিক সব সমস্যা থেকে মুক্ত আল্লাহর উপর ভরসা করেই ইন্টার্নি শুরু করলাম চেয়েছিলাম গাইনি দিয়ে শুরু করতে কিন্তু একাডেমিক্যালি আমার রোস্টার পড়ল সার্জারীতে প্রথমে এজন্য কিছুটা মন খারাপ ছিল মন খারাপটা আরো তীব্র হয়েছিল যখন আমাকে ডিপার্টমেন্টার হেডের ইউনিটে ইন্টার্নি করতে হবে এটা ভেবে কিন্তু ইউনিট চেইঞ্জ করার কোন সুযোগ ছিলনা পুরা চারমাসে সার্জারীতে ডিউটি করতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপে আমি বুঝেছিলাম সার্জারী ইউনিট-১ ছিল আমার জন্য আরেকটি বিশাল বড় রহমত সবকিছুতে অতিরিক্ত কিছু সুবিধা ভোগ করছিলাম আমার ফ্রেন্ড কাম কলিগরাও আমাকে অনেক ফেবার করত যেকোন কাজে নাইট ডিউট মেয়েদের ছিলনা ইভিনিং ডিউটিতে কখনও খুব খারাপ লাগলে আমার ফ্রেন্ড কে ডিউটি হ্যান্ডওভার করে চলে আসতে পারতাম সবমিলিয়ে সার্জারীতে কাজ শেখা, ডিউটি করা, সবার কাছে সহযোগীতা পাওয়া আমার ইন্টার্নি কে খুব অর্থবহ করে তুলেছিল তারউপর স্যার-ম্যাম দেরও আমার প্রতি আলাদা কেয়ারিং এটিচিউড আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সব আল্লাহর বিশেষ রহমত যা কেবল আমি ফাইয়াজের সুবাদে উপভোগ করছিলামআর আল্লাহর উপর ভরসা করে ইন্টার্নি শুরু করার সিদ্ধান্ত যে মোটেই ভুল ছিলনা এটাই  আরো বেশি করে বুঝলাম  


দীর্ঘ নয় মাস পর যখন ফাইয়াজ জন্ম নিল তার পরের দিন ফাইয়াজের বাবার বিসিএসের গেজেট প্রকাশিত হল একসাথে দুই আনন্দে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করার ভাষা খুজে পাচ্ছিলামনা বছর শেষে আমার ক্যারিয়ারে তখন দুইটা ডিগ্রি যুক্ত হল এক. এমবিবিএস ডিগ্রি, দুই. মাতৃত্বের অনুভূতি আসলে ক্যারিয়ার নিয়ে যেসব মেয়েরা অতিমাত্রায় সচেতন, এবং যেকারণে তারা সময়মত বিয়ে,সংসার,বাচ্চা নিতে ভয় পায় তাদের জন্য আমার একটাই পরামর্শ, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না আর আল্লাহর উপর ভরসা করলেই কেবল এই বিশেষ পরামর্শের উপযোগীতা উপলব্ধি করা যায় কোন কিছুই একাডেমিক ক্যারিয়ারের জন্য থেমে থাকবেনা বরং জীবনের সব পর্যায়কে ক্যারিয়ারের একটা পার্ট হিসেবে দেখলে দেখা যায় একসাথে সবকিছুই সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়ে যায় এই আমি যদি কেবল ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করতাম তাহলে কি বছর শেষে এত মূল্যবান দুইটা ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম ?? গভীরভাবে কি উপলব্ধি করতে পারতাম যে নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে?? নিশ্চয় সব প্রশংসা এবং ক্রেডিটের একমাত্র অধিকারী পরম করুণাময় আল্লাহ যিনি মানুষের প্রতিটা প্রার্থনায় সাড়া দেন

কষ্টের সাথেই স্বস্তি (১)

 তখন সবেমাত্র নতুন সংসার শুরু হল । এতদিন  বাবা মায়ের সংসারে যে আমার কখনও খুব একটা রান্না ঘরে ঢুকার প্রয়োজন হয়নি  সেই আমি তখন নতুন সংসার আর এম বি বি এসের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম । যাকে বলে একেবারে কুয়ার ব্যাঙ কে সমুদ্রের মধ্যে ছেড়ে দিলে যেরকম হয় আমার অবস্থা তার থেকে কম কিছু ছিলনা। চোখের পানি আর নাকের পানিতে আমার একেবারে কাহিল অবস্থা। এখনও সেসব কষ্টের দিনের কথা মনে পড়লে কান্না আসে। 

 প্রতিদিন ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর রান্না ঘরে চলে যেতাম। আলু ভর্তা,ডিম ভাজি কিংবা খিচুড়ি রান্না করে আমি চলে যেতাম আমার হাসপাতালে আর ফাইয়াজের বাবা তার হাসপাতালে। সারাদিন হলে থেকে টানা রাত দশটা পর্যন্ত আমি আর আমার রিডিং পার্টনার একসাথে প্রফের প্রস্তুতি নিতাম। এরপর ফাইয়াজের বাবা আমাকে নিতে আসত। দুজনে রিকশা করে সেই রাতে আমরা ছোট্ট সংসারে ফিরতাম। এরপর কোনরকম খাবারের কিছু ব্যবস্থা, নামাজ আর ঘরের টুকিটাকি কাজ শেষ করে যখন বিছানায় যেতাম তখন রাত একটা পার হয়ে যেত। এরপর আবার সেই পুরান রুটিনের সাইকেল। ঘরের কাজ বলতে দুই একদিন পরপর ঝাড়ু দিতাম। আর মাসে দুই একবার আমার মা এসে পুরা সংসার ঝেড়ে মুছে, কাপড়-চোপড় সব ধুয়ে একেবারে তকতকে করে দিয়ে যেত। মাঝে মাঝে আব্বু এসে একগাদা রান্না তরকারি দিয়ে যেত। সেসব ফ্রিজে রেখে কয়েকদিন পার করে দিতাম। সে কয়েকদিন হয়ত আমার রান্নাবান্নার ঝামেলা কম থাকত। একটু সকাল সকাল রাতে ঘুমাতে যেতে পারতাম। এই তো ! কারণ সবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও আমাদের দুজনের সাপ্তাহিক ছুটি বলে কিছু ছিলনা। ফাইয়াজের বাবার শুক্রবারও ডিউটি থাকত আর আমিও চলে যেতাম সেই ভোরে আমার হলে, টানা গাধার মত পড়ার জন্য। এতকিছুর পরেও স্বস্তি ছিল এটা যে সংসারের সব ঝামেলা আমরা দুজন মিলেই করতাম। হয়ত আমি রান্না করেছি, খাওয়া শেষে ফাইয়াজের বাবা সব প্লেট-বাটি সুন্দর করে ধুয়ে রেখেছে। হয়ত আমি ঘর ঝাড় দিচ্ছি ওদিকে সে নোংরা কাপড়-চোপড় সব ওয়াশ করছে। কখনও আমি একটু অসুস্থ হলে রান্না বান্না, ধুয়া মুছা সব সেই করেছে। আমার ফাইনাল প্রফের বিরাট ধাক্কা বেচারার উপরও গিয়েছে। 

আর হলে থেকে আমি আর আমার রিডিং পার্টনার ম্যারাথন পড়া দিতাম। দুজনই ছিলাম বিবাহিত। তাই দুজনেরই কিছু সাংসারিক ঝামেলা মিটিয়ে প্রফের প্রস্তুতি নেয়া ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এজন্য অন্য কারো সাথে আমাদের পড়াশুনার রুটিনের বিন্দুমাত্র কোন মিল ছিলনা। সবাই রাতে জেগে পড়ে,সকালে দেরি করে উঠে। আর আমরা মোটামুটি সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত টানা পড়তাম। মাঝখানে কেবল খাওয়া,গোসল আর নামাজের বিরতি। আমাদের এরকম হাভাতের মত পড়া দেখে আশে পাশে সবাই টিজ করত। কিন্তু আমরা দুজন জানতাম এরকম না পড়লে প্রফে পাশ তো দূরের কথা বসার যোগ্যতাও হবেনা। সারা বছরের জমানো মেডিসিন, সার্জারি আর গাইনির পাহাড়সম সিলেবাসের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ডাক্তার হবার জন্য এরকম পড়াশুনা ছাড়া আমাদের সেকেন্ড কোন অপশন ছিলনা। তার উপর তো ওয়ার্ডে গিয়ে গিয়ে কেতাবি জ্ঞান রোগীদের উপর একদফা ঝাড়া লাগত। হুম, এভাবেই চলছিল নতুন সংসার আর বহু কাংখিত ডাক্তার হবার চূড়ান্ত প্রস্তুতি ।

জানুয়ারির ১তারিখে ফাইনাল প্রফ শুরু হল। রিটেন শেষ হল খুব ভালভাবেই। এরপর অসপিও ভালভাবে শেষ হল। এরমধ্যে ফাইয়াজের বাবার বিসিএসের ভাইভার রেসাল্ট দিল। আলহামদুলিল্লাহ টিকে গেল। কষ্টের মধ্যেও একটু আনন্দের ছোয়া। ভালভাবেই চলছিল সব । কিন্তু ভাইভা  শুরুর কয়েকদিন আগেই আমি টের পেলাম ফাইয়াজকে আল্লাহ পৃথিবীতে আসার জন্য নির্ধারন করে দিয়েছেন। প্রেগন্যান্সি টে্সটেও পজিটিভ আসল। শুরু হল প্রেগন্যন্সির প্রথম তিন মাসের শারীরিক ধাক্কা, সাথে ভাইভার মহা টেনশান। সবমিলিয়ে এক দুর্বিসহ জীবন শুরু হল.........



চলবে...