শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১১

ফিরে দেখা ২০১০ : প্রেম

ব্যাপারটা দুঃখজনক কিনা জানিনা, তবে আমার বেশিরভাগ ফ্রেন্ডের বয় ফ্রেন্ড আছে। সো তাদের কাছে আমি ভয়াবহ এক আজব জিনিস। একদিন তারা এই প্রেম বিষয়ক ব্যাপার নিয়ে বিস্তর গবেষণা চালাল। মেইন টার্গেট ছিলাম আসলে আমি। কেন আমি প্রেম করিনা। আমি কোন কিছুই কারণ ছাড়া ব্যাখ্যা করিনা। যদি কেবল ইসলামিক ভিউ থেকেও বলতে হয় তাহলেও আমাকে লজিক্যাল কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। ইনফ্যাক্ট তারা কেউই অত ধর্মের ধার ধারেনা। সুতরাং খুব ক্রিটিক্যাল মুহূর্ত ছিল সেটা আমার জন্য, কারণ আমি ওদের কাছে ধর্মের দোহাই দিয়ে পার পাবনা। আমাকে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।
যাইহোক সেই মুহুর্তে আমি পার পেয়ে গেলাম। কারণ আমার যুক্তি তাদের ভয়াবহ পছন্দ হয়েছে। যদিও খুব সাধারণ একটি কথা বলেছিলাম। খুব স্মার্টলি বলেছিলাম---“দেখ, আমি তোদের মত অতটা ডিটারমাইন্ড না। যার সাথে আজ আমি কমিটমেন্টে গেলাম, (ইনফ্যাক্ট রিলেশান বলতে আমি কমিটমেন্টকেই বুঝি) পরবর্তিতে আমি সেই কমিটমেন্ট রাখতে পারব কিনা আমি জানিনা। কারণ আমার পরিবার, তার পরিবার, পরিবেশ, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যত সবকিছুই অনিশ্চিত। এত অনিশ্চয়তার মধ্যে আমি কি করে এত বড় একটা মেজর কমিটমেন্টে যাই!! আমি তোদের মত এতটা ডিটারমাইন্ড আসলে না”।
তারা আমার এই জবাবে খুব খুশি। কিন্তু এই খুশিও যে বেশিদিন টিকবেনা কে জানত!!

আরো কয়েকমাস পর আবার সেই প্রেম বিষয়ক আলোচনা। বরাবরের মত এবারও টার্গেট আমি। কারণ ইতোমধ্যেই আমার পূর্বের জবাবের বিরুদ্ধে শক্ত এক লজিক টেনে এনেছে তারা। হুম, আমি বলেছিলাম ভবিষ্যত অনিশ্চিত, তাই রিলেশানের কমিটমেন্ট হয়ত রাখা সম্ভব না। কিন্তু সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতকেও তারা এবার নিশ্চিত করেছে। কিভাবে? ওকে, শুনেন তাদের লজিক... “ শোন তুই যাকে পছন্দ করবি অর্থাৎ যার সাথে তোর রিলেশান থাকবে তার সাথে তুই পালিয়ে বিয়ে করবি। তাহলে তোর কমিটমেন্ট তুই সহজেই রাখতি পারলি। আর পরিবারের ব্যাপারেও সমাধান আছে। যখন তোর বাবা-মা দেখবে যে মেয়েটা তাদের বিয়ে করেই ফেলেছে তখন তারাও অগত্যা মেনে নিতে রাজি হবে। সুতরাং দুইদিক থেকেই তুই সেইফ থাকলি। কোন কিছুই আর অনিশ্চিত থাকলনা”।
বুঝেন এবার তাদের যুক্তি, কোথায় এপ্লাই করেছে!! আমি তো কিছুক্ষন তাদের লজিক শুনে মিউট হয়ে গেছিলাম। কিন্তু তারপরও খুব সাধারণভাবে এবারও যা বললাম সেটাও তারা মেনে নিল। কি বললাম, জানেন? ---“ দেখ, বছরের পর বছর যার সাথে প্রেম করব তাকে আমার সত্যি খুব বোরিং লাগবে পরে। এমনিতেও প্রেম না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র গল্প করা ক্লাসের ছেলেদেরও আমার খুব বোরিং লাগে। যে আমার লাইফ পার্টনার হবে তার সবকিছুই যদি আমি বিয়ের আগেই জেনে যাই, শেয়ারিং,কেয়ারিং,ভালবাসা এসবের মেইন স্পিরিট শেষ হয়ে যাবে তাহলে। আর বিয়ের পর যাকে আমি প্রথম চিনব তাকে চিনতেই চিনতেই তো রিলেশান অনেক স্ট্যাবল হয়ে যাবে। তাই না? সো অসব প্রেম আমাকে দিয়ে হবেনা।”
উফ!! এই জবাবটাও তাদের পছন্দ হল। কারণ ইতোমধ্যে তাদের প্রেম জমে বরফ হতে শুরু করেছে। একজন তো বলেই ফেলল, তার নাকি এখন বয়ফ্রেন্ড কে খুব বোরিং লাগে। অনেকবার ট্রাই করেই ব্রেক আপ করতে পারছেনা। কিভাবে যেন প্রতিবারই ব্রেক আপ মিস হয়ে যাচ্ছে। একেই বলে মনে হয় আজকালকার প্রেম! যদিও জানিনা ভবিষ্যতে তারা আবার কি লজিক নিয়ে আমার কাছে আবার আসবে?

বছরের শুরু থেকেই একজনের প্রেম শুরু হল, যেখানে আমিই নাকি ছিলাম ভিলেন। একসময় এই প্রেমের সূত্র ধরে তার সাথে বন্ধুত্বও শীতল হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সেই শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করতে পারিনি। পরে ওটা গন কেইস হিসেবে রেখে দিলাম। আরেকজনের সাথে রিডিং পার্টনার হিসেবে পড়তে পড়তেই দুজনে চরম ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেলাম। ধরে নিলাম তার নাম নীলা। উল্লেখ্য আমরা কেউই কিন্তু লাইব্রেরিতে পড়িনা, হলের রুমে বসেই পড়তে স্বাচ্ছন্দ অনুভব করি। কারণ আমরা কলেজের রিডিং রুম ও লাইব্রেরি রুমগুলো বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের জন্য ছেড়ে দিয়েছি। তারা নিশ্চিন্তে ওখানে প্রেম-স্টাডি দুটাই চালাতে পারে। যেহেতু আমরা সেরকম কিছু না, তাই নিজেদের রুমেই স্টাডি করি।

ঘটনাক্রমে নীলার যে বয়ফ্রেন্ড তার সাথে সম্পর্কের অবনতি হওয়া শুরু করল। কারণ হচ্ছে আমি। নীলার বয়ফ্রেন্ডের অভিযোগ নীলা নাকি আমাকে বেশি টাইম দেয়, আমার সাথে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। আর যেহেতু নীলা ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে লাইব্রেরিতে স্টাডি করেনা, সুতরাং তাদের রিলেশান খুব খারাপের দিকে যেতে লাগল। আমি তো কিছুটা টেনসানে ছিলাম, কারণ এখানে আমি কিছুই করছিনা, তারপরেও ভিলেন হয়ে যাচ্ছি আমি। নীলার যদি আমার সাথে গল্প করতেই বেশি ভাল লাগে সেটা কি আমার দোষ নাকি! আজব!! পরে নীলার বয়ফ্রেন্ডের সাথে আমার কথা হল। তাকে খুব সহজেই বললাম যে-- দোস্ত, তুমি আসলে প্রেম করতে জাননা। তা না হলে, তোমাদের প্রেমের মধ্যে আমি কেমনে থার্ড পারসন হই? আমি তো আর ছেলে না যে তোমার প্রেমিকার সাথে প্রেম করব।
এই কথাগুলো সে খুব সিরিয়াসলি নিল। পরে আমাকে বলল যে, আসলেই সে বুঝতেছেনা কিভাবে নীলার সাথে সম্পর্ক ভাল করা যায়। আমার কাছে টিপস চাইল। আমি তো ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললাম, ওসব প্রেমের ব্যাপার আমি বুঝিনা বাপু! তোমাকে কেমনে টিপস দেই বল...!!
জানিনা শেষ পর্যন্ত এই প্রেমে কোথায় গিয়ে গড়ায়। কারণ এটা এখনও কন্টিনিউয়াস প্রসেস। তবে আর যাইহোক শেষ পর্যন্ত আমি যেন কোন ঝামেলায় নাই পড়ি সেই চেষ্টা করে যাব।

আর নিজের প্রেম? আসলে আমি জানিনা প্রেমের ডেফিনিশান টা আসলে কি। এইতো দুইদিন আগে দুলাভাই বাসায় বেড়াতে আসলেন। ভাইয়ার সাথে আমরা সব ভাই-বোন, কাজিনরা অনেক মজা করছিলাম। কথায় কথায় দুলাভাই তার এক বান্ধবির কথা বলছিলেন ঠিক এভাবে--- “ ......সেই বান্ধবির নাম ছিল পাতা। তার সাথে আমার সম্পর্ক আসলে ভালই ছিল। আমি জানতামনা প্রেম বলতে আসলে কি বুঝায়। তবে আজকে এত বছর তার কথা মনে করতে গিয়ে মনে হল আসলে তার সাথে আমার মনে হয় প্রেম ছিল...”। সবাই একযোগে হেসে ফেললাম।

এখন আমিও ঠিক বলতে পারছিনা, কারো সাথে সত্যি আমার প্রেম আছে কিনা। তবে হয়তবা দুলাভাইয়ের মত অনেক বছর পর ব্যাপারটা আমি ঠিকই ধরতে পারব। আমি আশাবাদি।

ফিরে দেখা ২০১০: মোবাইল

মোবাইল নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ ছিলনা এবছরে। প্রচলিত অর্থে বিড়ম্বনা না এটা। কারণ মোবাইল ক্রাইম যেভাবে বেড়েছে সেখানে মোবাইল নিয়ে বিড়ম্বনারও মানুষের শেষ নাই। কিন্তু আমার টা ভিন্ন। আসলে কেউ কখনও আমাকে মোবাইলে বিরক্ত করতে পারেনি এপর্যন্ত। কারণ বিরক্ত করবে কি করে? আমি বিরক্ত হলেই না আমি বিরক্ত হব! আচ্ছা ঘটনা খুলে বলি তাহলে।

পারসোনাল মোবাইল আমি প্রথম ব্যবহার করি ২০০৬ সাল থেকে। সো তখন থেকেই অপরিচিত নাম্বার থেকে প্রচুর কল, মিসডকল আসতে থাকে। এই বছরের মাঝামাঝি তে একবার প্রচুর অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসতে থাকে। যেহেতু আমি অনেক ব্যস্ত থাকি। তাই খেয়াল থাকেনা কে কখন ফোন দেয়। তাই কে কখন কি মেসেজ দিল, কে মিসডকল দিল এসব নিয়ে কখনই মাথা ব্যথার সময় থাকেনা। কিন্তু মজার ব্যাপার, এক শুক্রবারে একজন অপরিচিত লোক আমাকে ফোন দিয়ে বলে- “ আচ্ছা আপু আপনি কি একটুও ডিস্টার্বড হন না? গত এক সপ্তাহ ধরে আমি আপনাকে কন্টিনিউয়াস মিসডকল দিয়ে যাচ্ছি। দিনে কমপক্ষে ২০ বার করে। আপনার কি একটুও জানতে ইচ্ছা করে না যে এক আমাকে এরকম মিসডকল দিচ্ছে?”
আমি তো পুরাই অবাক। কি বলে এই লোক। আমি বললাম “ স্যরি, ভাইয়া আসলে মোবাইল চেক করা হয়না আমার সেরকম। তাই দেখিনি আপনি আমাকে কতদিন ধরে কতবার মিসডকল দিচ্ছেন।“
এই হচ্ছে ব্যাপার। কিন্তু এই সমস্যার আরেকটি ভয়াবহ দিক আছে। পরিবারের অনেকেই আমাকে ফোন করে ঠিক যখন আমি ক্লাসে থাকি। পরে ক্লাস শেষে বাসায় যেতে যেতে বিকাল হয়ে যায় তখন আর খেয়াল থাকেনা যে কে আমাকে ফোন করেছিল। সুতরাং আমার নামে প্রচুর কমপ্লেইন আসে আমার আম্মার কাছে। কিন্তু কি আর করা! তাদের কে তো ব্যাপারটা বুঝানো যাবেনা।
মোবাইলের আরেকটা ব্যাপার আছে সেটা হল, আমি সবসময় মোবাইল ভাইব্রেইট করে রাখি। যেকোন সময় যদি ক্লাসে ফোনে রিং হয় তাহলে তো সমস্যা হতে পারে। আর তাছাড়া যেকোন পাবলিক প্লেইসেও আমি মোবাইল ভাইব্রেইট করে রাখতেই পছন্দ করি। অযথা মোবাইলের রিংটোন অন্যের জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু এই ভাইব্রেইট করা নিয়েও বাসায় একদিন প্রচুর বকা দেওয়া হল আমাকে। আমি নাকি ভাইব্রেইট করে রাখি যেন কারো ফোন রিসিভ করতে না হয় এজন্য। যাইহোক বকাবকি শুনে আমি মোবাইলে রিংটোন মোড দিলাম।

পরেরদিন সকাল বেলা ছিল আমার পরীক্ষা। রিংটোন অফ করতে মনে নাই। পরীক্ষার হলেই আমার মোবাইল বেজে উঠল। এপ্রনের পকেটেই ছিল মোবাইল। কিন্তু পরীক্ষার টেনসান এত বেশি ছিল যে আমি নিজেই টের পাইনি যে আসলে মোবাইলে রিং হচ্ছে। আমার পাশে বসা ফ্রেন্ড যদি না বলে দিত যে আমার এপ্রনের পকেটেই মোবাইল বাজছে তাহলে হয়তবা সেই পরীক্ষা আর আমার দেওয়া হতনা। অনেক কৃতজ্ঞ সেই ফ্রেন্ডের প্রতি আজও।
এরপর আরেকদিন প্যাথোলজি ভাইভা দিচ্ছি। ঠিক ভাইভার টেবিলেই আমার ফোন বেজে উঠল। খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ম্যাডাম অনেক ভাল ছিলেন বলে আমার দিকে কিছুক্ষন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন, হয়ত ভাবছিলেন আমার এত বড় সাহস কি করে হল যে ভাইভার টেবিলে মোবাইল অফ না করে চলে আসি। ম্যাডামের ওই দৃষ্টি আর ভাবতে ভাবতেই আমি মোবাইল অফ করে ফেলে খুব সুন্দর করে করুণ চোখে স্যরি বললাম। কাজ হল। বেচে গেলাম সেবার ও।
এরপর আরেকদিন মাইক্রোবায়োলোজি লেকচার ক্লাস, স্যার সেদিন মোবাইল নিয়ে নসিহত দিচ্ছিলেন। স্যার বলছিলেন, যে উনি একজন টিচার হয়েও ক্লাসে মোবাইল অফ করে আসে, ক্লাস চলাকালীন সময় কোন ফোন কল রিসিভ করেননা। আর আমরা কিনা স্টুডেন্ট হয়ে মোবাইল অফ করিনা, বরং জোরে জোরে রিংটোন বেজে উঠে ক্লাসের ফাকেই। হাউ ডেয়ার ইউ!! ঠিক তখনি আমার ফোন বেজে উঠল। একেবারেই অন দ্যা স্পট। স্যার তখন আমাকে কি করবেন একচুয়ালি সেটা বুঝতেছিলেননা। কারণ এই মোবাইল নসিহতের মধ্যেও কারো ফোন বেজে উঠতে পারে সেটা উনার কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। সম্ভবত স্যার মেয়ে বলেই আমাকে সেদিন আর কিছু বলেননি, জাস্ট আমাকে টাইম দিলেন মোবাইল অফ করার জন্য। কিন্তু ছেলে হলে সেদিন যে আমার বারোটা বেজে যেত কোন সন্দেহ ছিলনা। সেদিনই কেন যেন মেয়ে হিসেবে নিজেকে নিয়ে খুব গর্ব অনুভব করছিলাম। থ্যাঙ্কস আল্লাহ ফর ক্রিয়েটিং মি এজ এ গার্ল!!!!

ফিরে দেখা ২০১০ : টাকা

টাকার ব্যপারে আমি খুবই অসচেতন। এটা যে ইচ্ছা করে তা নয়, বরং আমি বহুবার চেষ্টা করেছি সচেতন হবার। কিন্তু পারিনি। কত টাকা যে আমার হারিয়ে গেছে, আমি টেরই পাইনি। কিংবা আমার ব্যাগ থেকে কত টাকা যে আমার ভাই সরিয়েছে তাও কোনদিন টের পাইনি। কারণ কত টাকা আমার কাছে আছে তা আমি নিজেও জানিনা। এবছর টাকা নিয়েও কিছু মজার ঘটনা ঘটে গেল।
একবার রিকশা করে যাচ্ছিলাম আমার ফ্রেন্ডের বাসায়। যাবার পথে একটা ওভার ব্রিজ পার হয়ে আবার রিকশা নিতে হয়। তো ওভার ব্রিজের সামনে নেমে আমি ভাড়া দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার ব্যাগে কোন টাকা নাই। অথচ আমি দিব্যি ভেবে নিয়েছি যে আমার ব্যাগে টাকা আছে। এরপর আর কি করা! নিকটস্থ এক পরিচিতার বাসা ছিল কাছেই। কিন্তু হেটে যেতে হয় অনেকদূর। রিকশাওয়ালাকে ব্যাপারটা খুলে বললাম। বেচারা তো আমার উপর খুবই বিরক্ত। যাইহোক আমার বিনয় দেখে কিছু আর বলেনি। পরে অনেকদূর হেটে যেতে এবং আসতে প্রায় আধা ঘণ্টা পর ভাড়া মিটালাম।
বছরের শুরুতেই প্ল্যান করেছিলাম যে মোবাইলে আমার এক্সাক্টলি কত খরচ হয় এখন থেকে সেভাবে খেয়াল করব। কিন্তু সেই হিসাব একসপ্তাহ থাকে। পরে ভুলে যাই। ইনফ্যাক্ট এখনও আমি জানিনা যে মোবাইলে আসলেই আমার খরচ কত হয়। তো একবার এক সিনিয়র ভাইয়ার কাছে একটা বিষয়ে পরামর্শের জন্য ফোন করেছি। ভাইয়া আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমার মোবাইলে টাকা আছে কিনা। আমি বলে দিলাম যে আছে। কারণ আমার মনে হচ্ছিল, কিছুদিন আগেই আমি রিচার্জ করেছি। সুতরাং মোবাইলে এখন যথেষ্ট ব্যালান্স আছে। কিন্তু মাত্র দুই মিনিট কথা বলার পর দেখি লাইন কেটে গেছে। ব্যালান্স শেষ!
নীলক্ষেত গিয়েছি বই কিনতে। আমার এই একটা ব্যাপারে দারুন ফ্যাসিনেশান আছে। বলা যায় আমার বই কেনার বিলাসিতা আছে চরম। কিছু বই আমার পড়া আছে, তারপরও দেখা গেছে সেই বই আমি কিনে নিয়ে চলে এসেছি। কারণ বই চোখের সামনে দেখাও আমার জন্য ভাল লাগার ব্যাপার, সেটা যতই পড়া হোক না কেন। লাইব্রেরিতে গিয়ে অনেক বই সিলেক্ট করলাম কেনার জন্য। এরপর ক্যাশ মেমো করতে গিয়ে ১৫০০ টাকা হয়েছে বিল। আমি তখনও জানিনা, আমার কাছে কত টাকা আছে। পরে বিল পে করতে গিয়ে দেখলাম যে ১২০০ টাকা আছে। খুব লজ্জাজনক ব্যাপার। এরপর দুইটা বই কমিয়ে ১২০০ এর কাছাকাছি বিল দিয়ে বাসায় আসলাম। শেষ পর্যন্ত এরকম হল যে বাসায় এসে দেখি ০ পয়সাও নাই।
এটাতো একটা ঘটনা। অন্য আরেকদিন বই কিনতে গিয়েছিলাম। মেডিকেলের বই অনেক দামী। একটা বই কিনলাম, যার দাম ৫০০ টাকা। আমি দোকানদারকে ১০০০ টাকার নোট দিয়ে দিব্যি চলে আসছি। কিছুদূর আসার পর মনে হল কেউ আমাকে পিছন থেকে ডাকছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি আমাকে বাকি ৫০০ টাকা নিয়ে যাবার জন্য ডাকছে। খুবই হাস্যকর ঘটনা। দোকানদার তো আমার দিকে তাকিয়ে দিব্যি হাসতেছিল। যদি সেই দোকানদার আমাকে না ডাকত আমার টাকার কথা মনেই থাকতনা।

কোথাও গেলে আমি ভিড় সবসময় খুব এড়িয়ে চলি। ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বইমেলাতে গিয়েছিলাম বই কিনতে। সেখানে গিয়ে তো মাথা খারাপ হবার মত অবস্থা। সবাই কত্ত বই পাগল না হলে এরকম মারাত্বক ভিড় হয়। তারপরও চেষ্টা করলাম ঢুকার। ঢুকার পর দেখি বের হবার মত পথ নাই। যাইহোক বহুক্ষন দাঁড়িয়ে আছি, সবার বই কেনা দেখছি। জাফর ইকবালের ইকারাস বইটা যেভাবে বিক্রি হচ্ছে আমার তো মনে হচ্ছিল না জানি এটা কি! দেখলাম সবাই আর কিছু কিনুক আর না কিনুক ইকারাস একটা করে কিনছে। আমিও একটু আগ্রহী হলাম। অল্প কয়েক পেইজে চোখ বুলালাম। আহামরি কিছু না যে এরকম মহামারি আকারে বিক্রি হচ্ছে। সাথে আমার কাজিন ছিল সেতো রীতিমত তখন ইকারাস কেনার জন্য প্রায় কান্নাকাটি শুরু করেছে। কিনে দিলাম। কত দাম ছিল মনে পড়ছেনা। তবে ঘটনা যা ঘটল তা হল আমি টাকা না দিয়েই চলে আসতে যাচ্ছিলাম। সেবার ই মনে হয় এরকম উল্টা ঘটনা ঘটল। যাইহোক সেই লজ্জাকর অভিজ্ঞতা মনে পড়লে এখনও লজ্জা লাগে।
টাকা ধারের ব্যাপারেও একই ঘটনা। কাকে কত টাকা দিয়েছি তা আমার কখনই মনে থাকবেনা। কয়েকমাস আগে একজন ফ্রেন্ড আমাকে ২৫০ টাকা দিচ্ছে। আমি বললাম, কি জন্য। বলল, ধারের টাকা ফেরত দিচ্ছে। আমি তো অবাক! কবে ধার দিয়েছি আমি? সে বলল ৫/৬ মাস আগে নাকি ওকে ধার দিয়েছিলাম। সেটা ফেরত দিচ্ছে। যাক বাবা! ফেরত তো দিয়েছে।
আর কারো কাছে টাকা ধার নিলে তো আমি বলেই দেই যে প্লিজ আমাকে মনে করিয়ে দিও। আমার মত খুব কমই আছে, তাই যথাসময়ে আমি অন্যের টাকা ফেরত দেই, কারণ তারা আমাকে মনে করিয়ে দেই......

ফিরে দেখা ২০১০ : জুতা

জুতা নিয়ে সমস্যা আমার অনেক আগে থেকে। তবে এবছর সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করল। আমার এক কাজিন, যে সবসময় তার জুতা নেই বলে রীতিমত আক্ষেপ করতে থাকে। অথচ এমন কোন অকেশান নাই যে অকেশানে সে নতুন জুতা নেয়নি। এমনিতেই আমি সবসময় জুতা নিয়ে সমস্যায় থাকি। সেদিন তো বিরক্ত হয়ে গেলাম ওর জুতা আক্ষেপ নিয়ে। কতগুলো জুতা আছে দেখতে চাইলাম ওর কাছে। প্রথম তো সে বলে তার কোন জুতা নেই, কি দেখাবে। আমি বললাম যা আছে তাই দেখাও। একটা একটা করে জুতা দেখাতে দেখাতে মোট ১১জোড়া জুতা দেখাল। তাকে বললাম, বাহ! ভালই তো তোমার জুতা না থাকাই ভাল। না থেকেই ১১জোড়া, থাকলে না জানি কত হত!

এই জুতা ব্যাপারটা কেন জানি আমার একদমই সয়না। প্রতি মাসেই নতুন জুতা কিনতে হয়। এমন না যে বিলাসিতা। সমস্যা আমার জুতা ছিড়ে যায়। সর্বোচ্চ দেড় থেকে তিন মাস জুতা লাস্টিং করে। ইনফ্যাক্ট বর্তমানে কেউ জুতা দেখতে চাইলে আমি মাত্র একজোড়া দেখাতে পারব। কারণ সত্যি আমার এই একজোড়া ছাড়া আর নাই। মেয়েদের নাকি কিছু স্বভাব থাকে। প্রচুর শপিং, কেনা-কাটা, সৌখিন, ফ্যাশন সচেতন ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। কেন জানিনা এই ব্যাপারগুলোতে আমি খুব মিতব্যয়ি। প্রয়োজন আর সৌখিনতার মধ্যে আমি সবসময় প্রয়োজনকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তাই অতিরিক্ত কোন ব্যবহার্য জিনিস আমি রাখিনা। তারউপর যদি সৌখিন জিনিস হয় তাহলে তো একেবারেই না।
গত মাসে আমার কাজিন একটা সুন্দর কানের দুল গিফট করল। সেই কানের দুল নিয়ে আমি এখনও অস্বস্তিতে আছি। যেহেতু জিনিসটা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় তাই এই কানের দুল নিয়ে কি করব তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। অবশেষে ভাবলাম কারও যদি এটা পছন্দ হয়ে যায় তাহলে ওকে সেটা দিয়ে দিব।

যাইহোক জুতা প্রসঙ্গে আসি। জুতা ছেড়ার কাহিনী আর কি বলব। ক্যাম্পাস হলে তো মোটামুটি সবাই জানে যে আর কারো জুতা না ছিড়লেও আমার জুতা ছিড়বেই। এজন্য অতিরিক্ত জুতা সবসময় আমার ফ্রেন্ড রা আমাকে প্রোভাইড করে। আশ্চর্য ব্যাপার, বাটা কোম্পানির জুতা নাকি খুব স্থায়ী হয়। সেই জুতাও আমার কাছে তিন মাসের বেশি লাস্টিং করে নাই। আব্বু-আম্মু তো খুব বিরক্ত আমার উপর। আমি নাকি জুতা পরার উপযুক্ত না। আচ্ছা আমার কি দোষ?
জুতা নিয়ে কাহিনী ছেড়া পর্যন্ত শেষ হলেও কিছু বলতামনা। অবশেষে জুতা থেকে আমার পায়ের স্কিনে এলার্জির সমস্যা হল। স্যারের কাছে দেখাইলাম। স্যার বলল জুতা চেইঞ্জ করতে। স্যারের কথামত জুতা চেইঞ্জ করলাম। কিন্তু সমস্যা আর কমেনা। এখন শুধু এই জুতা সমস্যার জন্য স্যারের কাছে বার বার যেতেও ভাল লাগেনা। পরে ঠিক করলাম, জুতার জন্য পায়ে যাইহোক স্যারের কাছে যাবনা। পারলে ইন্টার্নি করছে এক কাজিনের কাছে ফোনে এডভাইস চেয়েছি, প্যাথলোজি বই পড়েছি, ফার্মাকোলোজি থেকে ড্রাগস এর নাম জেনে নিজের চিকিৎসা করেছি তবুও স্যারের কাছে যাইনি। একসময় পায়ের অবস্থা এমন দাড়াল যে আমি আর জুতাই পরতে পারিনা।
এরপর শুরু হল ব্যান্ডেজ চিকিৎসা। পায়ে সুন্দর করে ব্যান্ডেজ পরে জুতা পরতাম। সবাই প্রথমেই জিজ্ঞেস করে আমার কোন এক্সিডেন্ট হয়েছে কিনা। ফ্রেন্ডদের বুঝানো গেলেও বাইরের কাউকেই বুঝানো যায়নি যে এটা আমার নিছক জুতা সমস্যা। সবাই মনে করে না জানি কত সিরিয়াস! ব্যান্ডেজ চিকিৎসা দুইমাস চলল। মোটামুটি ব্যান্ডেজ চিকিৎসা আমার জন্য উপকারি হল। ব্যান্ডেজ খুলার পর যখন আবার খালি পায়ে জুতা পরলাম আমার মনে হল যে আমি এতদিন পা ছাড়াই চলেছিলাম। ব্যান্ডেজ এর পর জুতা পরে পায়ের অনুভূতি দুই মাস টের পাইনি।

ভাবলাম এবার থেকে নিশ্চয় জুতা নিয়ে আমার আর সমস্যা হবেনা। কিন্তু এবার জুতা নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হল। এতদিন জুতা ছিড়ে যেত, এখন আর ছিড়ে যায়না ঠিকই। কিন্তু এমন পিচ্ছিল হয়ে যায় যে আমি জুতা পরে হাটার সময় বেশিরভাগ সময় পড়ে যায়। আরে! এটা কি ধরনের সমস্যা...? কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই সিরিয়াস। যেকোন জুতাই এখন আমি পায়ে দেবার কিছুদিনের মধ্যে খুব মসৃন ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে সেটা পরে হাটতে সমস্যা হয়। যাইহোক এই সমস্যা দূর করতে খুব শক্ত সোলযুক্ত জুতা কেনা শুরু করলাম। কিন্তু সমস্যা একই থাকে।

অবশেষে বছরের শেষে এসে হিসাব করলাম এই বছরে আমার কতগুলো জুতা কেনা হয়েছে। দশ জোড়ার বেশি জুতা আমি কিনেছি, কিন্তু একটাও এখন পরার উপযুক্ত না।সর্বশেষ সাতদিন আগে দুইজোড়া জুতা কিনেছি। ইতিমধ্যে একজোড়া জুতায় কিছু সমস্যা অনুভব করছি। আল্লাহই জানে, কি অপেক্ষা করছে এই জুতা নিয়ে।
সামনে ২০১১। প্লিজ আমার জুতা ভাগ্য যেন এটলিস্ট সুপ্রসন্ন হয়ে যায় সেই দোয়া চেয়ে আমার এই জুতা কাহিনী শেষ করছি।

শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১০

আমার স্টুডেন্ট !

টেনশনে আছি রুহিত কে নিয়ে। রুহিত আমার স্টুডেন্ট। উহু, শুধু আমার না। আমার ভাইয়েরও। দুজনই পার্ট টাইম পড়ায় ওকে। যখন আমার পরীক্ষা থাকে তখন আমার ভাই আর আমার ভাইয়ের যখন অন্য কাজ থাকে তখন আমি। এভাবেই চলছে আজ চার মাস। আসলে বাড়িওয়ালা আন্টির সাথে এরকমই কথা হয়েছিল যে আমি বিজি থাকলে আমার ভাই পড়াবে। তো সেভাবেই চলছে...
এই পর্যন্ত খুব বেশি যে স্টুডেন্ট পড়িয়েছি তা না। তবে যাদের পড়িয়েছি তাদের থেকে রুহিত আলাদা। কি রকম আলাদা?
যদিও আমি শুধু ম্যাথ আর বিজ্ঞান পড়াই তারপরও আমি মাঝে মাঝে রুহিতের সাথে গল্প করার জন্য অন্য সাবজেক্টের আলোচনাও করি। একদিন রুহিতকে বললাম,
- আচ্ছা রুহিত, হাজার বছর ধরে উপন্যাস কেমন লাগে তোমার?
- ভালই তো লাগে, আপু।
- একটু বলবা হাজার বছর ধরে উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত কাহিনী?
- (কিছুক্ষন চুপ থেকে শুরু করল) মকবুল বুড়া খুব খারাপ একটা লোক। একদিন করল কি জানেন আপু?
- কি করল?
- সে রাতে তার বৌ দের দিয়ে সবার অগোচরে অনেক অনেক কষ্টের কাজ করাল যা কিনা কেবল গরুই করতে পারে, মানুষ না।
- আচ্ছা, কাহিনী টা আমি জানতে চাইছি...
- এটাই তো কাহিনী!
- হুম, বুঝেছি। তাহলে আমাকে একটু বলতো হাজার বছর ধরে উপন্যাসের সামারি কি?
- আমি আসলে আপু বুঝতেছিনা কিভাবে মানুষ হাজার বছর বেচে থাকে? এই নাম দেয়ার মানে বুঝতেছিনা, তাই সামারি আমার ব্রেইনে আসতেছেনা।
- ওকে বলা লাগবেনা। তুমি পরের ম্যাথটা কর।

এই হচ্ছে রুহিত। যে কোন উপন্যাস বা গল্পের কাহিনী বা সামারি বলতে বললে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে কাহিনী শেষ করে। গত রোজার ঈদের পরে রুহিত কে বললাম
- তোমার দেখা সবচেয়ে প্রিয় মুভি কোনটি?
- আমি তো মুভি দেখেছি একটা। ভালই লেগেছে
- মাত্র একটা?
- জি। কারণ পড়ার চাপে আমি মুভি দেখার টাইম পাইনা।
- আচ্ছা, কোন মুভি দেখেছ?
- থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার।
- হুম। এই মুভির কাহিনী কি?
- এত বড় কাহিনী কিভাবে বলি!
- না না, সংক্ষিপ্ত করে বললেও হবে।
- আচ্ছা। একদিন রুবা সন্ধায় তার স্বামীর সাথে হাটছিল। হঠাৎ পুলিশ ওদের ধরে থানায় নিয়ে গেল। এরপর ওদের বহু প্রশ্ন করতে লাগল। এরকম করে কাহিনি এগিয়ে যায়...
- আচ্ছা বুঝেছি। মুভিটার সামারি কি?
- মুভিটার সামারি তার নামের মধ্যেই আছে। থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার। মানুষ হচ্ছে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার। তাই তার আরো মানুষ দরকার যেন সে প্লুরাল হতে পারে। হাজার হলেও মানুষ হচ্ছে সামাজিক জীব।
- গুড। দারুন বলেছ তো!

আমার পরে যখন একদিন আমার ভাই পড়াতে গেল সেতো রীতিমত বিরক্ত। মেজাজ খারাপ করে সে আমাকে বলল “ আচ্ছা তুই রুহিতকে পড়াস কি করে? আজকে ওকে আমি চার ঘণ্টা ধরে সাইন থিটা=লম্ব/ অতিভুজ, কস থিটা= ভূমি/অতিভূজ পড়ালাম। অথচ সে বার বারই ভুল লিখে যাচ্ছে। ধ্যাৎ আজকে আমার সারাদিন নষ্ট ওর জন্য।“
আমার ভাইকে বললাম, “ রুহিত হচ্ছে যান্ত্রিক টাইপ বুঝেছিস। তুই ওকে সাইন থিটা, কস থিটা ২০ বার করে মোট ৪০ বার লেখা। দেখবি পরে ঠিক হয়ে যাবে। কারণ বার বার লিখতে লিখতে সেটা ওর ব্রেইনে সেট হয়ে যাবে।“ সত্যি সত্যি আমার ভাই ওকে ২০ বার করে মোট ৪০বার লেখানোর পর রুহিত ঠিকভাবে বলতে পারে।
যাইহোক ইদানিং আমি রুহিত কে নিয়ে খুব বেশি টেনশনে আছি। ২০১১ তে ওর এসএসসি পরীক্ষা। ম্যাথ ওকে রিভাইস করাচ্ছি। রুহিতের আরেকজন টিচার আছে যে ম্যাথ ও বিজ্ঞান ঠিকমত পড়া হচ্ছে কিনা সেটা মনিটর করে। সেই টিচার রিভাইস করা ম্যাথ থেকে ওকে আটটা অংক করতে দিয়েছে সেদিন, রুহিত ৩ঘণ্টা পর একটা অংক মিলাতে পেরেছে। সেই খাতা পরে দেখে আমার তো মাথা খারাপ হবার মত অবস্থা। আমি রুহিত কে এবার বললাম
- রুহিত, তোমার এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে কি টেনশন হয়?
- জি আপু হয়।
- তাহলে পড়াশুনা বাদ দিয়ে টেনশান কর।
- মানে?
- মানে হল, তুমি যখন টেনশান কর তখন তোমার ব্রেইনের যে পার্ট পড়াশুনা মেইন্টেইন করে সেটা ব্লক হয়ে যায়। তাই তুমি যদি সত্যি সত্যি পরীক্ষায় পাশ করতে চাও তাহলে টেনশান বাদ দিয়ে পড়াশুনা কর।
- আপু, আমার মনে হচ্ছে আমি ছিটকে পড়ে যাব।
- হুম, যাবা তো! কিন্তু আমার কথা হচ্ছে তুমি তো সর্বোচ্চ ফেইল করবা। তাহলে টেনশান কিসের?
- ফেইল করলে তো আমি পানিতে ডুবে যাব।
- মানে?
- মানে পরীক্ষা হল পানির মত। পাশ করতে না পারলে সেই পানিতে আমি ডুবে যাব।
- হুম। তো কি হয়েছে? তোমাকে সেই পানি থেকে উঠিয়ে সাতার শেখাব। তারপর আবার পরের বছর তোমাকে পানিতে নামিয়ে দিব। তখন ডুবে যাবানা। তাহলে টেনশান কিসের???
- একবার যদি ডুবে যায়, তাহলে কি আর আমি পানি থেকে উঠতে পারব?
- আচ্ছা, রুহিত আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে...
- ঠিক আছে আপু, আপনি টেনশান কইরেননা। আমি দেখি কি করা যায়...

উফ! বাসায় এসে মনে হল, ছেড়ে দে মা কেন্দে বাচি টাইপ অবস্থা। আহারে! ওর জন্য খুব খারাপও লাগে আবার। পাশ করতে পারলেই ওর বাবা-মা ওকে নিয়ে মাথায় করে রাখবে। কিন্তু সেই পাসই ওর জন্য ভয়াবহ কঠিন ব্যাপার। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আমি অপেক্ষা করছি। রুহিত যদি পাশ করে তাহলে আমি যতটা খুশি হব তা মনে হয় আমার নিজের পরীক্ষার ভাল রেজাল্টের জন্য তত খুশি হবনা………

একটু খানি জীবন চাই...!!

হাতের মুঠো ফোনের দিকে যখন তাকায় তখন খুউব অবাক হয়ে যাই। কি এক আজব জিনিস যা আমাকে প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তে নিয়ে যায় নিমেষেই। প্রতি মুহূর্তে প্রিয়জনের সাথে ইচ্ছা হলেই যোগাযোগ করতে পারি। অপেক্ষা করতে হয়না একটুও। অন্তর্জালের মোহনীয় শক্তিতে ইচ্ছা হলেই মনের কথা অন্যের কাছে পৌছে দিতে পারি। তাই ডাকপিয়নের অপেক্ষায় আজ কারো প্রতিক্ষার প্রহর গুনতে হয়না। কিন্তু আজ খুব অপেক্ষা করতে ইচ্ছা হচ্ছে কারো হাতে লেখা চিঠি পেতে। যে চিঠির পরতে পরতে হাতের লেখার সাথে আবেগের উঠা-নামা অনুভব করতে পারব। মনের যত আকুলতা সেটাকে নিজের মনের আকুলতার সাথে একাকার করে ফেলতে পারব। ছোটবেলায় খালামনিকে একবার চিঠি লিখেছিলাম। চিঠির শেষে নিজের হাতের একটা ছাপ দিয়ে ছবিও একে দিয়েছিলাম। আম্মু জিজ্ঞেস করেছিল কেন এই ছবি আকা? শিশুসুলভ মন নিয়ে বলেছিলাম যে হাত দিয়ে খালামনিকে চিঠি লিখছি সেই হাতের ছবিও নিশ্চয় খালামনির দেখতে মন চাইবে, তাই এই ছবি আকা। এখন সেই স্মৃতি রোমন্থন করলে খুব হাসি পায়, কি হাস্যকর রকম মানসিকতা ছিল তখন। কিন্তু আজ আমি শিশুসুলভ সেই মানসিকতাকে খুব বেশি অনুভব করছি, খুব মিস করছি। আমাকে কেউ হয়তবা কখনও হাতে লিখে চিঠি পাঠাবেনা। তাই কারো আবেগ,ভালবাসা ও স্নেহের উষ্ণতা আমাকে আর শিহরিত করবেনা। যান্ত্রিকতার এই যুগে সবকিছু হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও আমি আজও খুজে ফিরি বারবার আদিম সেই প্রাচীন সম্পর্ক যা বার বার আবেগে আমাকে প্রকম্পিত করবে।

নস্টালজিক আমি কখনই সেরকম ছিলামনা। হতেও চাইনি। দৃষ্টিতে শুধু ভবিষ্যত দেখি। অতীত আমাকে প্রেরণা যোগায় কিন্তু কখনও অতীতে ফিরে যেতে চাইনি। অতীতের দুঃখ বর্তমানে আমাকে ব্যথিত করেনা, বরং ভবিষ্যতের জন্য পাথেয় যোগায়। কিন্তু তাহলে আজ কেন বার বার ব্যতিক্রম হচ্ছে। গ্রামের বাড়িতে যাবার পথে হাইওয়ের পাশে সবুজের মাঝে ছোট ছোট ঘর,পাশে বয়ে যাওয়া নদী,মাথার উপর অন্তিম আকাশ আর রাতের বেলায় ঘরের উঠোনে বসে জ্যোৎস্না স্নান করতে আজ খুব মন চাইছে। হোক না সাদা-মাটা জীবন তাতে কি! সেখানে আর কিছু না থাকুক অন্তত পরস্পরের প্রতি ভালবাসার কোন অভাব থাকতনা। ঠিক কবির মত আজ আমারও বলতে ইচ্ছা করছে ভালবাসাহীন হাজার বছর আমি চাইনা। চাই একটুখানি জীবন কিন্তু ভালবাসা, মায়া-মমতা,স্নেহের আবেগে পরিপূর্ণ এক সুন্দর পৃথিবী।

পৃথিবী আজ আমার ভাল লাগেনা। ভাল লাগেনা অপরের সাথে শুধুই যান্ত্রিক কোন সম্পর্ক। না, কোন অভিমানে নয় চরম বাস্তবতায় আজ আর আমার সত্যি পৃথিবী ভাল লাগেনা। এখানে কি আছে? হয়তবা হাতের মুঠোয় আমার পুরা পৃথিবী আছে কিন্তু কি লাভ সেই পৃথিবী দিয়ে? যেখানে মায়ের পরকীয়ার বলি হয় ভালবাসার সন্তানের। নিজ অস্তিত্ব কি আজ হুমকির সম্মুখিন? দশ মাস দশ দিন সুগভীর নিরাপত্তার মধ্যে থেকে শিশুটি যখন নিরাপত্তাহীন পৃথিবীতে পদার্পন করে তখন তার একমাত্র নিরাপত্তা তার মা। সেই নিরাপত্তার স্থানও আজ নিরাপত্তাবিহীন। এরকম পরকীয়ার বলি কেবল একজন নয়, হয়ত আরো বেশি। ভবিষ্যতে কি হবে ভাবতে ভয় পাচ্ছি...

প্রেমিক-প্রেমিকার ভালবাসার গভীরতাও আজ আর নেই। থাকবে কি করে? এখন বয়ফ্রেন্ড কিংবা গার্লফ্রেন্ড থাকা একটা স্ট্যাটাস। তাই ভালবেসে বিয়ে করে অতি দ্রুত বিচ্ছেদ হওয়া যেন অতি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। ঠিক কোথায় যেন আমরা সবাই ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি। যেখানে আমাদের ভালবাসা, বিশ্বাস, আস্থা সব হারিয়ে যাচ্ছে। জীবনে দুঃখ আসবে, দুর্দশা আসবে, বাধা আসবে, বিপত্তি আসবে কিন্তু তাতে কি? কারো ভালবাসার টানে, কারো আস্থার প্রতি আস্থা রেখে সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাব। নাহ! আজ সেই প্রেরণাও নাই। কারো প্রতি আজ আর আস্থা রাখতে পারিনা।

সন্তানের হাতে বাবা খুন কিংবা বাবার হাতে সন্তান খুন, এটা তো নিছক একটা দুঃসংবাদ এখন। পত্রিকার হাজারো দুঃসংবাদের মধ্যে এই দুঃসংবাদ এখন নিয়মিত প্রকাশিত হয়। শুধু এই নয়, আরো আছে। দুঃসংবাদের প্রকারভেদ শুনতে চান? প্রতিনিয়ত কোন না কোন মেয়েকে আত্বহত্যা করতে হচ্ছে ইভটিজিং এর কারণে। আজকাল কোন ছেলে আর মেয়েদের বোন হিসেবে সম্মান জানায়না। হয়ত বোনরাও আজকাল ভাইদের ভাই হিসেবে বিশ্বাস করতে পারেনা। সবই সম্ভাবনা...কিছুই জানিনা। শুধু এইটুকু অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পাচ্ছি চারপাশ থেকে ভালবাসা, বিশ্বাস আর আস্থা রা হারিয়ে যাচ্ছে।

পত্রিকার পাতা উল্টায়না আজকাল। বাতাসেই খবর যেভাবে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তাতে আর পত্রিকার পাতা পড়া লাগেনা। তবুও মাঝে মাঝে একটু খুজে ফিরি, কোন ভাল কিছু পাওয়া যায় কিনা! একটু ভালবাসার ছিটেফোটা দেখা যায় কিনা! বার বার হতাশ হই। বার বার চোখের মাঝে ভাসে আবু বকরের মত নিরীহ কোন ছেলে কিংবা দেশের হাজার হাজার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষারত সেইসব ভাইদের কথা যাদের মনে কতইনা স্বপ্ন ছিল দেশকে কিছু দেবার, দশের জন্য কিছু করার। ভালবাসাহীন এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তাদের থাকতে দেয়নি। আমি কোন রাজনীতি করিনা, চাইনা কোন ক্ষমতা, করিনা কোন দল, করিনা কারো পক্ষপাতিত্ব। শুধু একটুখানি ভালবাসা চাই, ভালবাসায় পরিপূর্ণ একটা ছোট পৃথিবী চাই। দরকার নেই মুঠো ফোন কিংবা অন্তর্জালের মত কোন যাদুকরি জিনিস। সেই পুরোনো পৃথিবীতে ফিরে যেতে চায়, যেখানে আর কিছু না থাকুক মায়ের ভালবাসার মত অটুট আস্থা মাথার উপর সর্বক্ষন থাকবে অন্তত।

উন্নয়নের দিক থেকে আজো আমরা পিছিয়ে আছি। তাই উন্নয়নের জোয়ারে ভাসার জন্য পরিবর্তন হয় সরকার, আমরা স্বপ্ন দেখি। হয়ত এবার আমরা কিছু একটা পাব, আর কিছু না হোক অন্তত বিশ্বাস আর ভালবাসা। কিন্তু হতাশ ও পিপাসার্ত মন বার বার হতাশ হয়, পিপাসায় গলা শুকিয়ে যায়। মনের পিপাসা মেটানোর জন্য কাউকে অভিভাবক হিসেবে পাশে পাইনা। প্রধাণমন্ত্রী নাকি একটা গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অভিভাবক, সেটাই জানতাম সব সময়। কিন্তু কই? প্রতিবারই কোন নৃশংস ঘটনার জন্য একটা নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠন কিংবা বিরোধী দল বারবার আমাদের অভিভাবকের চক্ষুশূল হয়! মা স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী আজ তার জনগনরূপ সন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে। হায়রে মা! হায়রে সন্তান! সব ভালবাসার স্থান আজ বিষে ভরা, দূষিত হয়ে গিয়েছে। কেউ কাউকে আমরা ক্ষমা করিনা, কেউ কাউকে ভালবাসিনা। তাই ট্রেন দুর্ঘটনায় খুব সহজেই অবলিলায় আমাদের দেশের অভিভাবক বিরোধী দলের উপর দোষ চাপিয়ে সস্তি খুজে পান। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য নির্বিশেষে বিরোধী দলকে ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে উল্লেখ করে। কি যে এই সস্তি তিনি পান আমরা জানিনা তবে আমরা বার বার আস্থা হারিয়ে ভবঘুরে হয়ে যাই।

শিক্ষা ব্যবস্থার চরম উন্নতি দরকার। এজন্য প্রয়োজন পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিশীলন। সেই লক্ষ্যেই যে শিক্ষা নীতির রূপ দেখলাম সেখানেও আবার আস্থা হারালাম। যান্ত্রিকতার এই যুগে প্রযুক্তির সাথে শিক্ষাকে সংযোগ ঘটানোর জন্য আমাদের অভিভাবকের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এখানেও মন ও মানসিকতা গঠনের উপকরনকে অবলিলায় ছুড়ে ফেলা হল। ধর্ম নিছক কোন ধর্মীয় ব্যাপার না যে এটা প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য বাধাস্বরূপ। যা দিয়ে আমরা এই পৃথিবী গড়ে তুলব তা কিন্তু ওই প্রযুক্তির মধ্যে নেই কিংবা ওই প্রযুক্তি আমাদের শেখাবেনা কিন্তু ধর্ম শেখাবে। আবার যে শিক্ষা নীতি বাস্তবায়ন করে আমরা উন্নত পৃথিবী গড়ে তুলতা চাইছি সেই পৃথিবীতে কিন্তু আমরা নিজেরাই আর বসবাস করতে চাইবনা। বিশ্বাস, আস্থা,ভালবাসা,মূল্যবোধ বিহীন প্রযুক্তিগত শিক্ষা দিয়ে যে পৃথিবী গড়তে চাইছি সেখানে হয়ত কেবল রোবটই বাস করতে পারবে, কোন মানুষ নয়। অথবা এরকম হতে পারে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় আমাদের মন-মগজের বিবর্তন হয়ে যাবে ফলে মানুষ আর ভালবাসা চাইবেনা, কারো প্রতি বিশ্বাস রাখবেনা, কোন স্বপ্ন দেখবেনা, কোন আস্থার সম্পর্ক চাইবেনা, কোন আবেগ থাকবেনা, অনুভুতিগুলো দুমড়ে মুচড়ে ভোতা করে ফেলবে...কেউ আর তখন কারো জন্য পরম ভালবাসা নিয়ে অপেক্ষা করবেনা, কোন মা তার সন্তানের জন্য ভালবাসার ছিটে-ফোটাও মনের গহীনে পোষণ করবেনা, স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসা হবে কেবল জৈবিক...

জানিনা এই দুঃস্বপ্নের প্রহর কখন শেষ হবে। নাকি এই দুঃস্বপ্নই সত্যিকারভাবে বাস্তবায়িত হয়ে যাবে কোন একদিন। তাহলে আমি আবার বলতে চাই ভালবাসাহীন এই পৃথিবীতে চাইনা আমি হাজার বছর, একটুখানি জীবন চাই যেখানে আস্থা, আবেগ,ভালবাসা আর বিশ্বাস আমাকে নতুন করে প্রাণে জোয়ার জোগাবে...একটুখানি জীবনের এই স্বপ্ন কি আমি দেখতে পারিনা?? নাকি এই স্বপ্নও অন্য কোন দুঃস্বপ্নের ভিন্ন রূপ!! 

প্রকৃত সুখের সন্ধান...

মানব মনের প্রকৃতি বড়ই বিচিত্র। কিসে সে কষ্ট পায় কিসে সে সুখী হয় তা সে নিজেই জানেইনা। হয়ত বিচিত্র মনের বৈচিত্রতায় আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। রাতের আকাশের যে মোহনীয় চাঁদ দেখে মন আনন্দে উদ্বেলিত হয় সেই একই চাঁদ দেখে চোখের কোণে জমে দুঃখের অশ্রুবিন্দু। সমুদ্রের বিশালতা কখনও এনে দেয় অসীম শূণ্যতা কখনওবা পূর্ণতা। বহুরূপী মনের এই সত্তা তাই বিশ্লেষণ করা খুব সহজ না।
কতটা অভিজ্ঞতা অর্জন করলে একজন নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবতে পারে? হঠাৎ এই প্রশ্নে চিন্তার জগতে ছেদ ধরল। আসলেই কি মানুষ কখনও পরিপূর্ণ হতে পারে? খুব চিরন্তন ও আদি প্রশ্ন। অভিজ্ঞতা অর্জনের মাপকাঠি নাকি বয়স! কিন্তু বয়সই কি সবসময় সেই মাপকাঠি হতে পারে?
আট/দশ বছরের কোন ছেলের অভিজ্ঞতার পরিসীমা কতটুকু? সাথে সাথে একটি চিত্র মনের পর্দায় ভেসে আসল । সকালে ঘুম থেকে উঠেই কিভাবে স্কুল ফাঁকি দেওয়া যায়, কিভাবে আজ বিকালে ক্রিকেট খেলায় জেতা যায় কিংবা বাবাকে যে নতুন গাড়ি,ক্যাটবেরি কিনতে বলা হয়েছে তা আনতে ভুলে যাবেনাতো! মাকে কিভাবে কনভিন্স করে কম্পিউটারে “মোস্ট ওয়ান্টেড’’ গেইমস খেলা যায়...এইরকম হাজারো চিন্তায় ছেলেটির মন বিভোর থাকে। একই বয়সের যে ছেলে গাড়িতে হেল্পার এর কাজ করে তার চিন্তা জুড়ে থাকে কিভাবে যাত্রী বেশি উঠানো যায়, কিভাবে বেশি টাকা আয় করে পরিবারের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়া যায়। সারাদিন কাজের ফাঁকে হয়ত সে চিন্তা করে তার মা চুলার পাশে বসে আছে এই অপেক্ষায় যে তার ছেলে কখন বাজার নিয়ে আসবে! আরো যে ছোট ভাই-বোন আছে তারাও সারাদিন বড় ভাইয়ের অপেক্ষায় থাকে। স্কুল ফাঁকি দেওয়া দূরে থাক পড়াশুনার চিন্তায় সেখানে বিলাসিতা মাত্র। চিন্তার এই অভিজ্ঞতা তার বয়সকেও হার মানিয়েছে। হয়ত অস্বাভাবিক কিন্তু বাস্তব...
এই অভিজ্ঞতা যেহেতু আমাদের নাই তাই এগুলো দেখতে দেখতেই আমরা অভিজ্ঞ। চারপাশে এত্ত অস্বাভাবিকতার ছড়াছড়ি মাঝে মাঝেই স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিকের মধ্যে পার্থক্য করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
সুখের সন্ধানে আজ মানুষ দিশেহারা। সুখের আসল সংজ্ঞা কেঊ দিতে পারেনি।কিন্তু আইন্সটাইন সেই অসাধ্য সাধন করে গেছে। পৃথিবীতে সব কিছুই আপেক্ষিক, কোন কিছুই পরম নয়। আমার কাছে যা সুখ অন্যের কাছে তা অসুখ। কিন্তু তারপরও সুখের সংজ্ঞা মিললেও সুখ খুজে পাচ্ছেনা মানুষ। সমাজের একটা পার্ট বাদ দিয়ে সুখের অন্বেষণ যেন ট্রেডিশানে পরিণত হয়েছে। শরীরের একটা অংশ প্যারালাইসিস হলে হয়ত তার ব্যথা অনুভব করা যায়না কিন্তু সেই অঙ্গের অনুপস্থিতি ঠিকই অনুভুত হয়।
অপূর্ণ শরীর হাজার চেষ্টা করলেও পূর্ণ হতে পারবেনা যতক্ষন না ওই অংশ ঠিক হয়। এসব কথা ভাবতেই পরিচিত একজনের কথা মনে পড়ল। সে বছরে আনুষ্ঠানিক একবার এতিমখানায়, মসজিদে টাকা দান করে আত্বতৃপ্তি অনুভব করে। মনে করে ইসলামের বড় একজন খাদেম...সবকিছুই ঠিক ছিল কিন্তু যদি সে ব্যাপারটা ট্রেডিশনালি না নিত , যদি মনে করত তার উপার্জনের টাকায় গরীবেরও হক আছে তাহলে হয়তবা সে এরকম অকেশনাল ইসলামের সেবা করে আত্বতৃপ্তি পেতনা। পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস/বিজয় দিবস উদযাপন সবই আজ নিছক ট্রেডিশান। একারনেই যারা পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ি পরে পুরো বাঙ্গালিয়ানা সাজে তারাই আবার থার্টি ফার্স্ট নাইটে ওয়েস্টার্ন কালচার খুব গর্বের সাথে পালন করে। নারী দিবসে নারী অধিকারের দাবি যাদের মুখে সোচ্চার হয় তাদের বিরুদ্ধে পত্রিকার পাতায় নারী নির্যাতনের অভিযোগে নিউজ আসে। খুব বিচিত্রভাবেই ট্রেডিশানের এই সিলসিলা প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ বিদ্যমান।
মানব মনের প্রকৃতি অনুসন্ধান করে চলছিলাম। অভিজ্ঞতা অর্জন নাকি এই রিসার্চে ওনেক হেল্পফুল হবে। সব কিছু প্র্যাকটিক্যালি অভিজ্ঞতা অর্জন যেহেতু সম্ভব না তাই দেখে দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। প্রকৃতি কখনও মনকে শূন্য থাকতে দেয়না। সুখের জন্য আকুল মন যে অংশ ডিলিট করে সেই অংশটি মন আরেকটি অংশ দিয়ে রিফিল করে। অটোমেটিক প্রোসেস। যে সত্তা মনকে একটিভলি লিড দিবে সে আজ প্যাসিভ। এই জন্যই হয়তবা যা কিছু করছি সব ট্রেডিশান, সব শুণ্য মনকে রিফিল করার চেষ্টা মাত্র। প্রকৃত সুখ পাবার প্রোসেসকে ইগ্নোর করে, সমাজের একটা পার্টকে বঞ্চিত করে সব কিছু ট্রেডিশনালি করে সবাই আমরা কৃত্তিম সুখের নিদ্রায় বিভোর । জানিনা এই নিদ্রার প্রহর কখন শেষ হবে...জানিনা দেখে দেখে অভিজ্ঞতা অর্জনের দিন কবে শেষ হবে...জানিনা ট্রেডিশনাল সুখের কালচার কবে সমাপ্তি হবে...